Tuesday, 22 Sep 2026
আন্তর্জাতিক July 18, 2026

সরকার ও আদিবাসীদের মধ্যকার শান্তি চুক্তিগুলো প্রায়শই বাস্তবায়িত হয় না: জাতিসংঘের হাই কমিশনারের অফিসে বিনোতাময় ধামাই

হিল ভয়েস, ১৭ জুলাই ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গে জেনেভার জাতিসংঘের অফিসে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ‘এক্সপার্ট মেকানিজম অন দ্য রাইটস অব ইন্ডিজেনাস পিপলস’ (এমরিপ)-এর সাবেক বিশেষজ্ঞ বিনোতা ময় ধামাই বলেছেন, “১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মতো সরকার ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যকার শান্তি চুক্তিগুলো প্রায়শই বাস্তবায়িত হয় না।”

গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এশিয়া অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঞ্চলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। ১৩ থেকে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত এমরিপের ১৯তম অধিবেশন চলাকালে ‘গ্লোবাল ইন্ডিজেনাস ককাস’ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের মধ্যে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিনোতা ময় ধামাইয়ের নেতৃত্বে গ্লোবাল ইন্ডিজেনাস ককাসের একটি প্রতিনিধিদল হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

তার বক্তব্যে শ্রী ধামাই বলেন, এশিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী বর্তমানে সামরিকায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ (এক্সট্রাক্টিভিজম), জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ উদ্যোগ, সংকুচিত নাগরিক পরিসর এবং দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরসহ নানা সংকটের সম্মিলিত প্রভাবের মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ আদিবাসীদের প্রথাগত শাসনব্যবস্থা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসীরা সামরিকীকরণ, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, কঠোর নজরদারি এবং আদিবাসী নেতা-কর্মীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। এর ফলে তাদের ঐতিহ্যগত শাসনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিশেষ করে আদিবাসী নারী, কিশোরী ও মানবাধিকার রক্ষাকারী কর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ছে।

শ্রী ধামাই আরও বলেন, আদিবাসী মানবাধিকার রক্ষাকারীরা ক্রমবর্ধমানভাবে খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার, কৌশলগত আইনি হয়রানি, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার এবং ডিজিটাল নজরদারির শিকার হচ্ছেন। ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত পরিবেশবাদী কর্মীরা বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানবাধিকার রক্ষাকারী কর্মীদের মধ্যে অন্যতম।

এশিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঞ্চলের পক্ষ থেকে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতি আদিবাসী মানবাধিকার রক্ষাকারীদের সুরক্ষায় আরও কার্যকর ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। এর মধ্যে নাগরিক পরিসর রক্ষা, প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ প্রতিরোধ এবং আদিবাসী নেতা, প্রবীণ ও সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এশিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঞ্চলে আরও ব্যাপক ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান, যাতে আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।

শ্রী ধামাই বলেন, রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অমীমাংসিত সংঘাতের কারণে এশিয়ার বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তিগুলো প্রায়ই বাস্তবায়নের অভাবে কার্যকারিতা হারায়। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো বাংলাদেশের ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, যা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং অভ্যন্তরীণ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অধিকারগুলো যথাযথ আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তিনি মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের অফিসকে এশিয়ার দেশগুলোর সরকারকে প্রয়োজনীয় আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।

পরিশেষে, বিনোতাময় ধামাই এশিয়ায় মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের অফিসের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি এ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সম্পদ বৃদ্ধি এবং আদিবাসীদের অধিকার বিষয়ক কাজের জন্য নিবেদিত ‘ফোকাল পয়েন্ট’ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের আহ্বান জানান। পাশাপাশি এ ধরনের পদে আদিবাসী পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।