হিল ভয়েস, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদক: সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবান জেলাধীন আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডে মাংগু মৌজায় দীর্ঘদিন ধরে পাড়াবন উজার করে গাছ কর্তনে আবুহান মোঃ ইসমাইল সওদাগরের নেতৃত্বে একটি চক্র জড়িত এবং লামা-আলীকদম বনবিভাগের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ব্যাপক হারে গাছ কর্তনের ফলে ঐ এলাকায় সেখানকার জীববৈচিত্র্য হুমকিতে রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র মোতাবেক, পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকইপাড়া ও আদুইপাড়া সহ ম্রো জনগোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষের খাওয়ার পানির প্রধান উৎস ব্যাঙঝিরি। কিন্তু বর্তমানে ঝিরিতে পানি পাওয়া প্রায় দুরূহ ব্যাপার। সেখানে প্রায় দুইশত একরের অধিক বনভূমি এলাকাজুড়ে চলছে বন উজাড়ের কর্মযজ্ঞ। যেখানে রয়েছে গর্জন, চম্পা, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া ও চাপালিশসহ নানা লালি প্রজাতির গাছ।

জানা যায়, পোলা ব্যাঙ ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি করা হয়েছে এবং রাস্তার দুই পাশে স্তুপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের গাছের গুড়ি। এসব গাছের দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ১০০ ফুট এবং প্রস্থ ১০ থেকে ১৫ ফুট। এলাকা হতে দুই বছর ধরে পাড়া বন থেকে ৩০ জন শ্রমিক দিয়ে আলীকদমের পানবাজার এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী আবুহান মোঃ ইসমাইল সওদাগরের নেতৃত্বে একটি চক্র, লামা–আলীকদম বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই বন ধ্বংসযজ্ঞ চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও কাটা গাছের একটি অংশ বনবিভাগ কর্তৃক অনুমতিপত্র ‘জোত পারমিট’-এর কাগজ দেখিয়ে বৈধতার আড়ালে আলীকদমসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে। অন্য অংশ আলীকদমের অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
আদুই পাড়ার কার্বারী কামপ্লাত ম্রো বলেন, এই ব্যাঙঝিরির পানির ওপর সাত-আটটি পাড়া নির্ভরশীল। বর্তমানে আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। নামচাক পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, দুই বছর আগেও এখানে হরিণ, ভালুকসহ নানা বন্যপ্রাণী ও পাখি ছিল। এখন বনও নেই, প্রাণীও নেই। পামিয়া পাড়ার মেন চং ম্রো বলেন, আগে ঝিরিতে প্রচুর পানি ও মাছ-কাঁকড়া ছিল। এখন পানি শুকিয়ে গেছে। পাড়াবাসী পানি নিয়ে চরম সংকটে আছি।
গ্রাম বাসীরা আরো জানান, পামিয়া পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া ও আদুই পাড়াসহ অন্তত পাঁচটি পাড়ার শতাধিক ম্রো পরিবার এবং লামা উপজেলার রুপসী পাড়া ইউনিয়নের সাঙক্রাত ম্রো পাড়া ও কুইরিং ম্রো পাড়ার লোকজনও এই বন ও ব্যাঙঝিরির পানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর অবৈধভাবে পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, ঝিরির পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়া এবং শতবর্ষী মাতৃগাছ কেটে নেওয়ার কারণে পুরো এলাকার জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে পড়েছে। ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে বিশাল পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা। এই রাস্তা দিয়ে ব্যবহার হচ্ছে ট্রাক দিয়ে নিয়মিত কাঠ পরিবহন।

এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ স্বরূপ লেখালেখি শুরু হলে গত (২২ এপ্রিল) আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের পামিয়া পাড়া ব্যাঙঝিরি এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই সময় অভিযানে কাঠপাচারকারীরা পালিয়ে গেলেও তাদের ব্যবহৃত স্কেভেটর অকেজো করা হয় এবং শ্রমিকদের অস্থায়ী আবাসস্থল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
উক্ত ঘটনায় সচেতন মহলের দাবি, দীর্ঘ দুই বছর ধরে আলীকদম-থানচি সড়কের এই গাছ পাচার করা হচ্ছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের সর্বাধিক নিরাপত্তা বাহিনী বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি কেউ বিন্দুমাত্র খবর পাইনি। পাহাড়ে প্রতিটি জায়গায়-জায়গায় চেকপোস্ট বিদ্যমান অথচ পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে একদল অসাধু ব্যবসায়ী এই গাছ নীরবে প্রশাসনের নাকের ডগায় পাচার করছে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ, সেই সাথে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে পরিবেশের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্বিচারে স্থানীয় জুম্মদের উচ্ছেদ করে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ এবং অবৈধভাবে গাছ নিধনের ঘটনা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মাটি ক্ষয়, পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি-এই সব সমস্যার্ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পাহাড়ে জুম্ম জনগোষ্ঠী তাদের ভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষায় ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।
