Tuesday, 22 Sep 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম June 1, 2026

ভূষণছড়া গণহত্যা দিবসে রাঙ্গামাটিতে পিসিপি’র স্মরণসভা ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠিত

হিল ভয়েস, ১ জুন ২০২৬, রাঙ্গামাটি: গতকাল রবিবার (৩১ মে ২০২৬) পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) রাঙ্গামাটি শহর শাখার উদ্যোগে ১৯৮৪ সালের ৩১ মে সংঘটিত ভূষণছড়া গণহত্যার স্মর‍ণে স্মরণ সভা ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

স্মরণ সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি রেং ইয়ং ম্রো, বিশেষ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক সুরেশ চাকমা, পিসিপি রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক দিগন্ত তঞ্চগ্যা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সদস্য লক্ষীদেবী চাকমা প্রমুখ।

স্মরণ সভার শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের আন্দোলনে এযাবৎ যারা আত্মবলিদান দিয়েছেন তাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

পিসিপির রাঙ্গামাটি শহর শাখার সাধারণ সম্পাদক ইমন চাকমার সঞ্চালনায় স্মরণ সভা ও প্রদীপ প্রজ্জ্বালন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিসিপি রাঙ্গামাটি শহর শাখার সভাপতি অনন্ত চাকমা। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন রাঙ্গামাটি শহর শাখার তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিলন চাকমা।

প্রধান আলোচক রেং ইয়ং ম্রো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ডজনেরও বেশি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে আজ থেকে ৪২ বছর আগে ১৯৮৪ সালের ৩১ মে, সেনা-সেটেলারদের দ্বারা সংঘটিত ভূষণছড়া গণহত্যা ছিল অন্যতম বর্বরোচিত ও লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞ।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীরা যেন রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী। ন্যায়বিচারের দাবিতে এগিয়ে এলে তাদের প্রায়ই দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়। সম্প্রতি বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলায় এক ৫ বছর বয়সী ত্রিপুরা শিশু একজন সেটেলার বাঙালির দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয় । এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবিতে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় জনগণ প্রতিবাদ জানাতে গেলে তারা সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর বাঁধার মুখে পড়েন।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞ, দমন-পীড়ন, ধর্ষণ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলোর সঠিক তথ্য দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। অতীতের এসব শোক ও বেদনা শক্তিতে রূপান্তরিত করে বর্তমান তরুণ ও ছাত্রসমাজকে অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে।

সুরেশ চাকমা বলেন, জুম্ম জনগণকে তাদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা এবং জুম্ম জাতিসত্তার অস্তিত্বকে বিপন্ন করার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনার বিচারের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত কিংবা বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আত্মকেন্দ্রিকতা, সুবিধাবাদ ও দোদুল্যমানতা পরিহার করে তরুণ সমাজকে অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ঘোষিত কর্মসূচি ও বৃহত্তর গণআন্দোলনে তরুণ ছাত্রসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে তিনি ছাত্র-যুব সমাজের প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

দিগন্ত তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চুক্তি পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

লক্ষীদেবী চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত অসংখ্য গণহত্যার একটিরও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার আজ পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলে সেনা ও সেটেলারদের সম্পৃক্ততায় ডজনেরও বেশি গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্র শুধু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হয়নি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা উদঘাটন এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতেও ব্যর্থ হয়েছে।