হিল ভয়েস, ১২ জুন ২০২৬, বাঘাইছড়ি: আজ শুক্রবার (১২ জুন) সকাল ১০ ঘটিকার সময়ে রাঙ্গামাটি জেলাধীন বাঘাইছড়ি উপজেলার ৩২ নং বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের নিউ লাল্যাঘোনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি বাঘাইছড়ি থানা কমিটি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন বাঘাইছড়ি থানা শাখার যৌথ উদ্যোগে কল্পনা চাকমা অপহরণের ৩০ বছর উপলক্ষে “জুম্ম নারীর উপর সহিংসতা বন্ধ কর-কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার নিশ্চিত কর, অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ কর” শ্লোগানে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বাঘাইছড়ি থানার নেতা পুলকজ্যোতি চাকমা। কাচালং সরকারি কলেজের সাবেক প্রভাষক মিসেস গৌরিকা চাকমা, কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক মিসেস সমাপ্তি দেওয়ান, পিসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য চিবরন চাকমা প্রমূখ।
এই সময় পুলকজ্যোতি চাকমা বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণের দীর্ঘ তিন দশক পেড়িয়ে গেলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কোন দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করতে না পারা সত্যিই দুঃখজনক ব্যাপার। এতে করে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা ও আইনের প্রতি আমাদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় পাহাড়ের মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতেও দু’বার ভাববে না।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন পর পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দীপেন দেওয়ানকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। কয়েক মাস আগেও তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক বক্তব্য দিয়েছিলেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু তাঁর আকস্মিক পদত্যাগ পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ, বিশেষ করে জুম্মদের মনে গভীর উদ্বেগ ও অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যে মানুষটিকে ঘিরে মানুষ নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখেছিল, তাঁর হঠাৎ সরে দাঁড়ানো সেই প্রত্যাশাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমরা এমনটা মোটেও আশা করিনি।
পুলকজ্যোতি আরও বলেন, জুম্ম জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, অধিকার ও টিকে থাকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে রাষ্ট্র প্রায় নীরব অবস্থান গ্রহণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য, কার্যকর উদ্যোগ কিংবা দৃশ্যমান অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে না। এই নীরবতা মোটেও শুভ লক্ষণ নয়; বরং এটি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলছে। আমরা মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নে সরকার কী করতে চায়, তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করা উচিত।
আমরা দেখেছি অতীতের সরকারগুলো চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যদি বর্তমান সরকারও সে একই পথে হাঁটে এবং সময়ক্ষেপণের কৌশল অবলম্বন করে, তাহলে জুম্ম জনগণের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও আস্থাহীনতা আরও গভীর হবে। এর ফলে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা যেকোনো বিকল্প খুঁজে নিতে বাধ্য হবে।
সমাপ্তি দেওয়ান বলেন, কল্পনা চাকমার ঘটনা থেকে শুরু করে এযাবৎকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের ওপর সংঘটিত বহু সহিংসতার ঘটনার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বিচার রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। কোনো রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ সংঘটিত হলে নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পাহাড়ের নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার বহু ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে না পারা রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুতর ব্যর্থতা হিসেবেই আজ বিবেচিত হচ্ছে। রাষ্ট্রকে একদিন অবশ্যই এই ব্যর্থতার মূল্য চুকাতে হবে।
গৌরিকা চাকমা বলেন, বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী হয়তো ভেবেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে সংগ্রামমুখী, আন্দোলনমুখী ও চেতনাসম্পন্ন মানুষদের হত্যা, গুম, অপহরণ কিংবা দমন-পীড়নের মাধ্যমে হিল উইমেন্স ফেডারেশনকে দুর্বল করে দেওয়া যাবে; সংগ্রামের বীজকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা যাবে।
কিন্তু তারা ভাবতে পারেনি, আদর্শ ও চেতনাকে কখনো বলপ্রয়োগে ধ্বংস করা যায় না। এশিয়া মহাদেশের সরোজিনী নাইডু, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার থেকে শুরু করে অসংখ্য সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের কথা আমরা জানি, যাঁরা অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাঁদেরকে থামিয়ে দেওয়ার, তাঁদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার বহু চেষ্টা হয়েছে। অনেকের জীবন শেষ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাঁদের আদর্শ, চেতনা ও সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। বরং তাঁদের চিন্তা ও সাহস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সমাজকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। ঠিক তেমনি, আজ কল্পনা চাকমা আমাদের মাঝে সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর সংগ্রামী চেতনা, সাহস ও প্রতিবাদের শিক্ষা জুম্ম সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে বেঁচে আছে। পাহাড়ের বুকে হয়তো আজ একজন কল্পনা চাকমা নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শত শত, হাজার হাজার নতুন কল্পনা জন্ম নিয়েছে। যে চেতনা ন্যায়বিচার, অধিকার ও মর্যাদার সংগ্রামের কথা বলে, সেই চেতনা কোনো অপহরণ, দমন-পীড়ন বা ভয়ভীতি দিয়ে নিঃশেষ করা যায় না।
কালিন্দী কুমার চাকমা আক্ষেপ করে বলেন, একদিন, দুইদিন, তিনদিন করে আজ আমার বোন অপহরণের দীর্ঘ ৩ দশক অতিবাহিত হতে চলেছে। সেসময়ে যিনি শিশু ছিলেন বা যাদের জন্মও হয়নি, আজ তারা অনেকেই পরিপূর্ণ যুবক। কিন্তু তারপরও আজ বোনের অপহরণের ঘটনায় ইতিবাচক কোন অগ্রগতি চোখে পড়লোনা।
তিনি আরও বলেন, সমতলে রাষ্ট্র চাইলে বিচার হয় কিন্তু পাহাড়ে কল্পনা চাকমার বেলায় ৩ দশকেও নয়। যেমন সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীর ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। কয়েকদিন পর হয়তো সেটাও কার্যকর করা হবে।
কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ তিন দশক পেরিয়ে গেলেও আমার বোন কল্পনা চাকমার অপহরণকারীদের রাষ্ট্র আইনের আওতায় আনতে পারেনি। সেই লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে করা মামলাগুলো একের পর এক আদালত থেকে খারিজ করে দেয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
চিবরন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারীদের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য দাবির প্রশ্নে কল্পনা চাকমাই ছিলেন সবচেয়ে সাহসী ও উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। আমার বিশ্বাস, জুম্ম নারী ও নারী অধিকারের বিষয়টি নিয়ে কল্পনা চাকমার মতো এত দৃঢ়, স্পষ্ট ও সোচ্চার অবস্থান আর কেউ গ্রহণ করেননি। তাঁর সংগ্রাম আজও জুম্ম নারীদের অধিকার আন্দোলনার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, আজকে আমরা পদে পদে যেসকল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মধ্যে এসকল সমস্যার ৮০% সমাধান অন্তর্নিহিত রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। জুম্ম তরুণ ও যুব সমাজকে সেই বৃহত্তর আন্দোলনে অধিকতরভাবে অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে।
এই সময় হিল উইমেন্স ফেডারেশন বাঘাইছড়ি থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক ভূমিকা চাকমার সঞ্চালনায় এবং মহিলা সমিতির বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সভাপতি মিসেস লক্ষীমালা চাকমার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশন বাঘাইছড়ি থানা শাখার সহ-সভাপতি সুমনা চাকমা এবং প্রতিবাদ সভার শুরুতে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের বিবৃতি পাঠ করেন, বাঘাইছড়ি হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জ্যোসি চাকমা।