Tuesday, 22 Sep 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম June 13, 2026

কল্পনা চাকমা অপহরণের তিন দশক: অপহরণ ঘটনায় অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে চবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

হিল ভয়েস, ১২ জুন ২০২৬, চবি: আজ ১২জুন ২০২৬ কল্পনা চাকমা অপহরণের তিন দশক পূর্তিতে অপহরণ ঘটনায় অভিযুক্ত লে. ফেরদৌস, মো. সালেহ আহমেদ, মো. নুরুল হক গংদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট চত্বরে বিকাল ৪:০০ ঘটিকায় এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চবি শাখার সহ-সভাপতি এনতেস চাকমার সভাপতিত্বে ও সাংগঠনিক সম্পাদক প্রেনঙি ম্রো’র সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন পালি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্ক বড়ুয়া।

এছাড়াও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চবি শাখার সাধারণ সম্পাদক রিবেক চাকমা, ছাত্র ইউনিয়ন, চবি সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক জেস চাকমা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দীপেন বিকাশ ত্রিপুরা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী জাল্লাং এনরিকো কুবি ও সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী কথি ম্রো প্রমুখ।

রিবেক চাকমা বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনা পাহাড়ি নারী তথা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এক নির্মম দৃষ্টান্ত। ত্রিশটা বছর পরও রাষ্ট্র কল্পনা চাকমার খোঁজ দিতে পারেনি, চিহ্নিত অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনতে পারেনি। যা দেশের বিচারব্যবস্থার দৈন দশাকে ইঙ্গিত করে। একইসাথে জুম্ম জনগণের ওপর রাষ্ট্রের মনোভাবকেও তুলে ধরে।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ভূমি বেদখল, ইসলামীকরণ, রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক তল্লাশির নামে হয়রানিসহ প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা সংগঠিত হচ্ছে। কিন্তু শুধুমাত্র জনরোষকে শান্ত করার জন্য অপরাধীদের আটক করে দুইদিন পর জামিনে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। অপরাধীরা দিবালয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে অপরাগ। যা পাহাড়ি জনগণকে আরও নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং অপরাধীদের এমন অপরাধ সংঘটিত করতে উৎসাহ যোগাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ের জুম্ম জনগোষ্ঠীর অধিকার ফিরে পায়নি। চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো অবাস্তবায়িত রেখে রাষ্ট্রব্যবস্থার অভ্যন্তরের একটি গোষ্ঠী চুক্তি বাস্তবায়নে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তারা চুক্তিকে নিয়ে নানা অপপ্রচার চালিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং চুক্তি বিরোধী গোষ্ঠীকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে নানা ভাবে। যা জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জেস চাকমা বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণের পর চাপে পড়ে সরকার একটি প্রহসনের তদন্ত করেছে। পাহাড়ের মানুষ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস রেখে সুবিচার পাওয়ার আশা করেছিলো। কিন্তু আজ এতো বছর পর সেই আশার মর্যাদা রাষ্ট্র রাখতে পারেনি। একইভাবে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বরও জুম্ম জনগণের সাথে করা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিও সরকার বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি। সরকার বারবার পাহাড়ি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে ক্ষুন্ন করেছে।

দীপেন বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমরা অধিকার ও মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা সেটা হতে দিচ্ছে না। আজকে কল্পনা চাকমার অপহরণের তিন দশক আমাদের বুঝিয়ে দেয় পাহাড়ের মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়াটা কতোটা কঠিন। রাষ্ট্রের এই বৈষম্য আমরা মেনে নিতে পারি না।

জাল্লাং এনরিকো কুবি বলেন, দীর্ঘ ত্রিশ বছর পরে এসেও আমরা কল্পনা চাকমার হদিস এখনো পাইনি। পাহাড়ে এতো এতো নিপীড়ন,আগ্রাসন সংঘটিত হয়েছে এবং হচ্ছে যে, বছরের পুরোটা কোনো না কোন বিচারের দাবি নিয়ে আমাদের মাঠে নামতে হয়, কথা বলতে হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র পাহাড়ি মানুষের জন্য কখনো সুবিচার নিশ্চিত করেতে পারেনি। কল্পনা চাকমা অপহরণের ত্রিশ বছরে পরে চিহ্নিত অপহরণকারীদের গ্রেফতার করতে না পারা এদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য সত্যিই লজ্জ্বাজনক।

কথি ম্রো বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণের ত্রিশটা বছর পার হয়ে গেলেও কল্পনা চাকমা কোথায় তার পরিবার আজও জানে না। বর্তমান সরকারকে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবসান করতে হবে। পাহাড়ের জনগণ সত্য ও ন্যায় বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চালিয়ে যাবে।

পরবর্তীতে সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আয়োজিত সমাবেশের সমাপ্তি ঘটে। সমাবেশ পরবর্তী এক বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি জিরো পয়েন্ট চত্বর থেকে শুরু হয়ে কাটাপাহাড় রোড হয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়।