শুভজিৎ চাকমা
এবার দেখা যাক সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র কি কিংবা কাকে বলে!
একটি রাষ্ট্রকে সাংবিধানিকভাবে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক বা (গণতান্ত্রিক) রাষ্ট্র বলা হয় তখন, যখন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস হয় জনগণ এবং নাগরিকরা নিয়মিত, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করে।
এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সংবিধান কি বলে দেখা যাক! গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশ একটি এককেন্দ্রিক প্রজাতন্ত্র যা “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ”নামে পরিচিত। বাংলাদেশ সংবিধান রাষ্ট্রের মূল আইন। এটি ১১ টি অধ্যায়ে বিভক্ত। এর প্রথম অধ্যায়ের ৭ নং অনুচ্ছেদের ১ নং দফায় বর্ণিত বিধান হলো-প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।
সংবিধানের পঞ্চম অধ্যায়ে আইনসভা গঠনের বিধান সন্নিবেশ করা আছে। এই অধ্যায়ের ৬৫ নং অনুচ্ছেদের বিধান হলো- ‘‘জাতীয় সংসদ”নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে।”
আবার এই অনুচ্ছেদের ২নং দফার বিধান হলো- “একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিন শত সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের ৩ নং দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে লইয়া [৫০ জন নারী সংরক্ষিত সদস্য] সংসদ গঠিত হইবে। সদস্যগণ সংসদ সদস্য বলিয়া অভিহিত হইবেন।”
অনুচ্ছেদ ৬৬ এর ১ নং দফার বিধান অনুযায়ী কোন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হইলে এবং তাঁহার বয়স পঁচিশ বৎসর পূর্ণ হইলে এই অনুচ্ছেদের ২ নং দফায় বর্ণিত বিধান সাপেক্ষে সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন। ২ নং দফার বর্ণিত বিধান হলো- কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি অপ্রকৃতিস্থ হন, দেউলিয়া হন, ফৌজদারী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হন আরো ইত্যাদি ইত্যাদি অযোগ্যতার কারণ দেওয়া আছে এই দফায়।
এবার দেখা যাক সংবিধানে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের নির্বাচন এবং কার্যপরিধি সংক্রান্ত কি বিধি-বিধান রয়েছে!
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রধান। এ সংক্রান্ত বিধি-বিধান সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ে সন্নিবেশিত রয়েছে। এই অধ্যায়ের ৪৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।’’
২ নং দফায় বলা আছে- ‘‘রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির উর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন এবং এই সংবিধান ও অন্য কোন আইনের দ্বারা তাঁহাকে প্রদত্ত ও তাঁহার উপর অর্পিত সকল ক্ষমতা প্রয়োগ ও কর্তব্য পালন করিবেন।’’
তেমনিভাবে সংবিধানের সপ্তম ভাগে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত বিধানাবলী সন্নিবেশিত আছে। এর ১১৯ নং অনুচ্ছেদের বিধান হলো- রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং নির্বাচন কমিশন এই সংবিধান ও আইনানুযায়ী-
(ক) রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন;
(খ) সংসদ-সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন;
(গ) সংসদের নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করিবেন;
(ঘ) রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার-তালিকা প্রস্তুত করিবেন।
মোট কথা যেহেতু বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী জনগণ দেশের সকল ক্ষমতার মালিক এবং জনগণের প্রতিনিধি কারা হবেন এবং কিভাবে সেই জনপ্রতিনিধিগণ জনগণের ক্ষমতার প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করবেন এবং কিভাবে ও কার মাধ্যমে এই সমস্ত জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন এবং কি কি প্রাথমিক যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠিতে নির্বাচিত হবার উপযুক্ত হবেন তাসহ প্রকৃত ও যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন এবং দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত যাবতীয় বিধি-বিধান বাংলাদেশ সংবিধানে সন্নিবেশ করা আছে সেহেতু সেই অনুসারে ইহা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ীও বাংলাদেশ একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক দেশ। এই ধরনের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকরা তাদের নির্বাচিত যোগ্য প্রতিনিধির মাধ্যমে আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং শাসন কার্যে অংশগ্রহণ করে থাকে। অর্থাৎ জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ না করে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে।
এখানে জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের নির্বাচিত জনগণের নিকট জবাবদিহিতা করার জন্য বাধ্য থাকেন। জনগণ তাদের পছন্দমত দল ও জনপ্রতিনিধিকে বাছাই করে নির্বাচিত করতে পারে। কারণ এই ধরনের শাসন ব্যবস্থায় একাধিক দল ও ব্যক্তি থাকে। জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে মানুষ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন করে যেখানে তারা মৌলিক মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা ভোগ করে এবং আইনের কাছে সমান আশ্রয় ও সুরক্ষা পেয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশ ইত্যাদি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো সকল দেশে সমানভাবে এবং পূর্ণ মাত্রায় এই শাসনতন্ত্র কাজ করেনা কিংবা প্রয়োগ হয়না। তার প্রয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নির্ভর করে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের কাছে নিজেদের ইচ্ছা প্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু পেয়ে থাকে এবং সেই প্রতিনিধিদের সে অনুযায়ী কাজ করার সদিচ্ছা কতটুকু আছে তার উপর।
তবে একটি সফল জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য উপরোক্ত বিষয়াবলী ছাড়াও আরো অনেক বিষয়-আসয় নির্ভর করে থাকে। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ করে স্বাধীনতার কিছু পরেই সমগ্র দেশে যে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিগত শতাব্দীর ৯০ দশকের প্রথম দিক হতে সেই সামরিক শাসনের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার পর যারা মধ্যপন্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল এবং এযাবত করে আসতেছে আর তারা ভবিষ্যতেও অতীতের মতো করতে চায় তাহলে আগের সেই অবস্থা ও পরিপ্রেক্ষিত ভবিষ্যতেও কাজ করবে তা ভাবার অবকাশ ও ভরসা বর্তমানে নেই বললেই চলে। কেননা বর্তমানের সমাজে মানুষের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ইত্যাদির অনেক প্রসার ও পরিবর্তন ঘটেছে। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখেও অনেক নতুন নতুন বিষয় ও ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। তাই এই সংক্রান্ত অন্যান্য অনেক মৌলিক বিষয় ও ক্ষেত্রের মধ্যে নিচের তিনটি ক্ষেত্রগুলোকে অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে পরিচালনা করতে হবে-
১। বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ মানুষের মধ্যে উগ্র ইসলামী চিন্তাধারা ও জাতীয়তাবাদের ব্যাপক প্রসার ও বিস্তৃতি লাভ করেছে যা মধ্যপন্থী রাজনীতি এবং সংখ্যালঘূদের টিকে থাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে এর মোকাবিলা করা;
২। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ-সংঘাত ও দ্বন্দ্বের কারণে আমাদের দেশের রাজনীতি ও তৎসংশ্লিষ্ট সকল কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে এক অদৃশ্য ও শরীরি শক্তি তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আঞ্চলিক ও বশ্বিক প্রভাবের বিষয়টি এখন আর কারো অজানা নয়। এই অবস্থা বর্তমানে আরো ঘনীভূত হয়ে আসছে বিধায় বাংলাদেশ বহুমুখী অবস্থান থেকে এর চরম নেতিবাচক পরিস্থিতির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে এর মোকাবিলা করা;
৩। বাংলাদেশের সমগ্র আদিবাসী জাতিসত্তাগুলোসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর প্রতি বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের প্রতি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় অব্যাহত রাষ্ট্রীয় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাষ্ট্রের আয়োজন ও কর্মে তাদের অংশগ্রহণ কিংবা অন্তর্ভূক্তকরণে অস্বীকৃতির (non-inclusive) সংস্কৃতি মোকাবিলা না করে অতীতের ন্যায় অপরিবর্তিত রাখলে বড় চ্যলেঞ্জ হতে পারে। উপরে বর্ণিত তিনটি মৌলিক বিষয় বাদ দিয়ে কিংবা যথাযথভাবে মোকাবিলা না করে বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা মানে হলো দেশকে অনেক ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে যাওয়া। তাই সেগুলোর যে কোন একটিকেও যথাযথ আইন নির্ধারিত ব্যবস্থা যদি থেকে থাকে তাহলে সেই অনুসারে এবং না থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিবেচনা করার বিষয় বাদ দিয়ে যদি কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তাহলে সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে ক্ষমতাসীন সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবারও সম্ভাবনা থাকে, এমনকি সেই যে ভুল সিদ্ধান্ত একবার গ্রহণ করা হয়েছে কিংবা হবে তা দিয়ে হয়তো তার ক্ষমতায় টিকে থাকাও কঠিন হতে পারে! কারণ এই সমস্ত বিষয় মোকাবিলা করার ব্যাপার আর এখন কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কলাকৌশলের মধ্যে কিংবা দেশের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কাজেই উপরে বর্ণিত তিনটি ক্ষেত্র কোনভাবেই অবহেলা করার নয়।
এবার দেখা যাক দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ কি স্বাভাবিক কিংবা স্বেচ্ছায় হয়েছে না করানো হয়েছে! এ প্রসঙ্গে ইতিমধ্যে অনেক বির্তক দেখা দিয়েছে। তবে যে সমস্ত তথ্য-উপাত্ত ও বিচার বিশ্লেষন উঠে এসেছে তা থেকে এটা বলার তেমন কোন যুক্তি ও সুযোগ নেই যে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন! তার আরো একটি কারণ আছে পদত্যাগ করার পর যখন তাঁর পদত্যাগ নিয়ে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম এমনকি দেশের বাইরেও এ নিয়ে নানা প্রশ্ন, কৌতুহল ও বিতর্ক সৃষ্টি হতে থাকে তখন পদত্যাগের ২ দিন পর স্বয়ং দীপেন দেওয়ান তাঁর ফেসবুক আইডিতে তাঁর কর্মী সমর্থকসহ শুভাকাঙ্ক্ষী ও সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান যে সবাইকে ধৈর্য্য সহকারে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার এবং সংযত আচরন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। কিন্তু তিনি সেখানে তাঁর পদত্যাগের কারণের বিষয়ে কোন কিছুই উল্লেখ কিংবা ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। অথচ যেহেতু তাঁর পদত্যাগের কারণ নিয়ে তাঁর কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সন্দেহ থাকায় এবং তাদের নিকট পদত্যাগের কারণ গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও বেদনা সৃষ্টি হয়েছে সেহেতু তিনি পতদ্যাগের প্রকৃত কারণ পুনর্ব্যক্ত করে তাদেরকে শান্ত করার এবং সংযত হওয়ার পদক্ষেপ নিতে পারতেন কিন্তু তিনি তাও করেননি এবং বলতে হবে সচেতনভাবেই করেননি যেহেতু তাঁর পদত্যাগের প্রকৃত কারণ পদত্যাগপত্রে উল্লেখিত কারণ নয়। আর তিনি সত্যিই যদি শারীরিকভাবে অযোগ্য হতেন তাহলে কিভাবে পদত্যাগ করার পর পরই তিনি সুস্থ সবল ও স্বাভাকিবভাবে থেকে তাঁর অনেক রাষ্ট্রীয় কাজে (সংসদ অধিবেশনে যোগদানসহ) ও দায়িত্বে নিয়োজিত হয়ে আসতেছেন এমনকি সর্বশেষ ১৮ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশনে একেবারে সুস্থ, সবল ও ধীরস্থির থেকে বক্তব্য প্রদান করতে পারেন তা নিয়ে আর বিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে কিংবা থাকে বলে মনে হয় না!
এমনকি তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের প্রকৃত কারণ তাঁর স্বাস্থ্যগত অযোগ্যতা, কিন্তু তাতেও কি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নৈতিক দায় এড়াতে পারেন! কারণ তিনি যদি সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশ একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাহলে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পূর্বে তাঁর নিজেকে নিজে প্রশ্ন করা উচিত ছিল সত্যিই কি তিনি দায়িত্ব পালনে শারীরিকভাবে এত অক্ষম এই তথ্য কি প্রধানমন্ত্রীর নিকট জানা ছিল না! অথবা জানা না থাকলে পদত্যাগ করার পর যখন জানতে পারলেন তিনি অসুস্থ তখন খবর নিতে পারতেন। কিন্তু দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করার পরে তাঁর পদত্যাগপত্র এত দ্রুতবেগে ছুটলো এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো তাতো রীতিমতো নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পড়ে যে প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রী পরিষদের একজন সদস্য (মন্ত্রী) অসুস্থতার খোঁজ খবর না নিয়ে পদত্যাগ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকবেন তা কেমন করে হয়। সাধারণ সৌজন্যটুকুও জানানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! ব্যস্তটা থাকতেই পারে মেনে নিলাম কিন্তু অনেক পরেও কি কিছু হয়েছে? দেখেতো বলতেই হচ্ছে যে এত অসহিঞ্চু হলে তো আপনার শপথ ভেঙ্গেই খান খান হয়ে গেলো না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
তাছাড়া পদত্যাগ করার পরে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের কারণ নিয়ে এত বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং হচ্ছে তা নিয়ে একটুও ভাববার সুযোগ রাখলেন না অথবা দীপেন দেওয়ানকে ডেকে জিজ্ঞাসাও করলেন না! আর তিনি নিজেকে নিজে এও ভাবলেন না যে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের জনমানুষদের নির্বাচিত এবং সবচেয়ে সৎ, যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রতিনিধিকে তাদেরই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে তাদের দ্বারা নির্বাচিত নন এমন এক ব্যক্তিকে অগণতান্ত্রিকভাবে তাদের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রেখে দিয়েছি এবং এতে করে তাদেরকে অন্যায় করা হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর চরম আঘাত করা হচ্ছে কি! মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত সংবিধানের মূল স্পিরিটকে অবমাননা করার সামিল। কারণ সংবিধান অনুসারে সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং এই মালিকানার অর্থ সামগ্রিকতাকে ক্ষুন্ন না করে যেমনি দেশের সকল জনগণ সমগ্র দেশের সার্বভৌমের মালিকানা দাবি করার অধিকার রাখেন তেমনি এই মূলনীতি অনুসারে একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকার সকল জনগণ ঐ এলাকার উপর সকল ক্ষমতা দাবি করারও অধিকার রাখেন।
কাজেই যেহেতু প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কেবল পার্বত্য এলাকার জনগণের কার্যপরিধি ও অধিকারের ক্ষেত্র এবং যেহেতু জনাব মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন পার্বত্য এলাকার জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন, সেহেতু তিনি সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার কোন নৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রাখেন না। কাজেই দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ স্বেচ্ছায় নয়, অবশ্যই তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। সরকারের এই কাজ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক স্পিরিটকে চরমভাবে লংঘন করেছে। প্রধানমন্ত্রী এই ব্যত্যয়ের প্রতি যত তাড়াতাড়ি দৃষ্টি দিবেন এবং সমাধানের কিংবা সংশোধনের উদ্যোগ নিবেন ততই পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জনমানুষসহ সমগ্র দেশের নাগরিকদের জন্য মঙ্গল হবে। আর এতে বাংলাদেশ প্রকৃত গণতান্ত্রিক যাত্রা পথের সন্ধান পাবে এবং রাষ্ট্র হিসেবে নিরাপদ হয়ে উঠবে।
তাছাড়া প্রসঙ্গক্রমে এখানে আলোচনা-পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা হতে পারে বর্তমানে বাংলাদেশ যে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও শক্তিধর দেশগুলোর স্বার্থ পরিপূরণের ক্ষেত্র হওয়ার যে নেতিবাচক অবস্থানে অবস্থান করছে এবং তেমনিভাবে দেশের বৃহত্তর সম্প্রদায়ের তথা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দ্বারা আভ্যন্তরীণ সামাজিক বাধা বিপত্তির মধ্যে আছে এই বাস্তবতা একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য ভালো দিক হিসেবে মোটেও বিবেচনার দাবি রাখে না। তাই এ পর্যায়ে সেই বিষয়ে কিছু পর্যালোচনা করা যাক।
আমরা জানি বাংলাদেশ একটি বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯১.০৪% মানুষ মুসলমান। তাদের সমগ্র সামাজিক জীবন ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়। রাষ্ট্রের এখানে তেমন কিছু করার নেই এবং থাকেও না। এটাই জনপ্রতিনিধিত্বমূলক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য চরম দুর্ভাগ্য! তাই এত বড় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মুসলিম দেশে ধর্মকে যে একটি কার্যকর রাষ্ট্রের মুলনীতির বাইরে রাখা উচিত এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারন করেই রাষ্ট্রকে চলতে দেওয়া উচিত তা সিংহভাগ অংশের মানুষের সাধারণ বোধের মধ্যেতো নেই-ই, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও ধর্মকে কেবল তাদের ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে সেটা আরো বড় দুঃখজনক! তাই এই দিক দিয়ে বাংলাদেশ জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তো অনেক দূরের কথা, এমনকি একটি কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে চলার জন্যও অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে আছে। তাই যারা মধ্যপন্থী রাজনীতি নিয়ে দেশ পরিচালনা ও শাসন করতে চান তারাও অত্যন্ত বিপদের মধ্যে আছেন যদিও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এ যাবত তারাই আসীন হন এবং হয়েই আসছেন।
আলোচ্য বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা ও বিশ্লেষন সবার কাছে আরো সহজবোধগম্য্য করে তোলার জন্য প্রসঙ্গক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর গঠন এবং কার্যপ্রণালী নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট একটি বিশেষায়িত মন্ত্রণালয় যা দেশের অন্যান্য মন্ত্রণালয় হতে কাঠামোগত এবং কার্যপ্রণালী অনুসারে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এই মন্ত্রণালয় গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘‘ঘ” খন্ডের ১৯ নং ধারা অনুযায়ী ১৫ জুলাই ১৯৯৮ সালের এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে। আরো পরিস্কার ও ভালোভাবে বোঝর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ঐ বিধান উল্লেখ করা হলো- ‘‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে। এই মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করিবার জন্য নিম্নে বর্ণিত উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হইবে।
১) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী, ২) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, ৩) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, ৪) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ, ৫) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ, ৬) সাংসদ, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা, ৭) সাংসদ, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা, ৮) সাংসদ, বান্দরবান পার্বত্য জেলা, ৯) চাকমা রাজা, ১০) বোমাং রাজা, ১১) মং রাজা, ১২) তিন পার্বত্য জেলা হইতে সরকার কর্তৃক মনোনীত পার্বত্য এলাকার স্থায়ী অধিবাসী তিন জন অ-উপজাতীয় সদস্য।
চুক্তির মূল বিধান অনুযায়ী এই মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাজের অনেক বিষয় নিয়ে সমন্বয় সাধন করবে। এই আইনী দিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে উল্লেখ আছে এবং কি কি বিষয়ে কাজ করবে সেগুলো চুক্তির বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদে পাশকৃত পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনসমূহে (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৮৯) পরিস্কারভাবে সন্নিবেশ করা হয়েছে। সেই আইন অনুযায়ী পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩৩ টি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে (হস্তান্তরিত ৩৩ টি বিষয়) যেগুলো পরিষদসমূহের মূল কাজ। সেই সব বিষয়সমূহের মধ্যে এক বা একাধিক বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের এক একটি মন্ত্রণালয়ের কাজের সাথে সম্পর্কিত এবং সেই অনুযায়ী পার্বত্য জেলা পরিষদের কাজ অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পর্কিত আর এই পরিষদগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান করার জন্য অঞ্চল পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং সেগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর সমূহের সাথে সমন্বয় করার জন্য জাতীয় পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও সেভাবে অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের কাজের ভিত্তিতে সমন্বয়কারী হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও সম্পর্কযুক্ত।
তাই এই মন্ত্রণালয়ের যিনি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন তিনি অবশ্যই পার্বত্য এলাকার মানুষের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হবেন এই কথাটি বোঝার জন্য সহজ কথা হলো এই বিষয়টি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে যেমনি পরিস্কার করে বলা আছে, তেমনি এটির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে এর স্পিরিটকে নিশ্চিতভাবে অনুধাবন করতে হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মাপকাঠিতে। প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, প্রধানমন্ত্রীর এইটাও বোঝা উচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়েও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব সেইভাবে নেই। সেখানকার ৯০% কর্মকর্তা-কর্মচারী অ-পাহাড়ি এবং অপার্বত্যবাসী! অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির স্পিরিট অনুযায়ী এই রকম হওয়ার কথা নয়।
এই ব্যাখ্যা অনুসারে প্রতিমন্ত্রী জনাব মীর হেলাল উদ্দিন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কোনভাবেই থাকতে পারেন না এবং থাকার জন্যে তাঁর কোন নৈতিক এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তি ও অধিকার নেই, এবং এর পরেও যেহেতু অনেকটা জোর করে থাকার মতো করে তিনি আছেন সেহেতু প্রাথমিকভাবে তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জবাবদিহিতা করতে বাধ্য থাকবেন হাটহাজারী ভোটারদের নিকট। পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন ভোটারদের নিকট নয়। কাজেই তাঁর এই পদে থাকাটা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ করে পার্বত্যবাসীদের বিষয় নয় বরং এটি পরিপূর্ণভাবে বাংলাদেশের বিষয় যে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে সবল এবং জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে কি থাকবেনা!