Tuesday, 22 Sep 2026
মতামত July 10, 2026

দিশেহারা ইউপিডিএফের বিভ্রান্তিকর পথচলা

সত্যদর্শী মুলিমম্যা

ইউপিডিএফ-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সময় বলা হয়েছিল এই দলটি হবে জনগণের সাচ্চা পার্টি। জুম্ম জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইউপিডিএফ হবে একটি প্রগতিশীল মতাদর্শিক রাজনৈতিক দল। দলটি পরিচালিত হবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা ও যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে। কোন প্রকার একনায়কতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি, তোষামোদী এবং দুর্নীতি এই পার্টিতে থাকবে না। সেই সাথে পার্টির নেতা-কর্মীরা চির নিপীড়িত জুম্ম জনগণের সাথে একই কাতারে থেকে লড়াই সংগ্রাম পরিচালনা করবে, আত্মত্যাগ এবং জীবন উৎসর্গের মন্ত্রে উজ্জীবিত থাকবে প্রতিটি নেতা কর্মী এটাই ছিল দলটির রাজনৈতিক লক্ষ্য।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত চুক্তি অসম্পূর্ণ ও আপোষ চুক্তি আখ্যা দিয়ে দলটি পাহাড়ে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করলো। সে সঙ্গে ঘোষণা করা হলো ইউপিডিএফ হবে পাহাড়ের ‘নয়া যুগের নয়া পার্টি।’ কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যতই দিন এগিয়েছে আমরা অবাক বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি, যারা ইউপিডিএফ দলটির এই সকল চটকদারী কথাবার্তায় মনে প্রাণে বিশ্বাস করে জীবনপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হলাম, অচিরেই বুঝলাম এযে শুধু নিছক ছেলেভুলানো গল্প। এসবই ছিল নিছক প্রতারণা, মিথ্যার ফুলঝুড়ি। প্রকৃতপক্ষে দলটি ষড়যন্ত্র এবং ধ্বংসের নীল-নকশা বাস্তবায়নের একটি আখড়া মাত্র।

ইউপিডিএফ দলটি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বললেও বাস্তবে সে ধরনের কর্মসূচি প্রদান করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচি এবং পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের ধরন নিয়ে পার্টির হাইয়েস্ট ফোরামে প্রচুর বাক-বিতন্ডা হয়েছে। প্রসিত খীসার অনুগামী চক্রের দুর্নীতি, দলটির ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসী তৎপরতা, অপরাধ কার্যক্রমে জড়িত হওয়া এসব নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম।

প্রসিত খীসা জুম্ম জনগণকে অনেকভাবে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় নিজেকে সক্রিয় রেখেছে। প্রথমত: জুম্ম জনগণের মধ্যে একটি ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ জিইয়ে রাখা, দ্বিতীয়ত: সেটেলার বাঙালিদের দু-এক জনকে অপহরণ-হত্যা করে তাদেরকে জুম্মদের উপর হামলা করতে প্ররোচিত করা এবং এভাবে জুম্মদের ভূমি, ভিটেমাটি সেটেলারদেরকে দখল করতে ইন্ধন জোগানো, তৃতীয়ত: জুম্মদের অপহরণ করে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করা। জোর জবরদস্তি করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জুম্মদের উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য থেকে উচ্চ হারে চাঁদা আদায় করে শ্রমজীবী জুম্মদের সর্বশান্ত করা, চতুর্থত: বিভিন্ন ছোটখাট ব্যবসায় নিয়োজিত জুম্মদের উপরে মোটা ট্যাক্স নির্ধারণ করে দিয়ে বাঙালিদেরকে অবাধ ব্যবসার সুযোগ করে দেয়া। পঞ্চমত: একটা সশস্ত্র আন্দোলনের হাবভাব জিইয়ে রেখে সেনাবাহিনীকে পার্বত্য অঞ্চলে বহাল রাখার সুযোগ করে দেয়া এবং সেনা শাসনকে জায়েজ করতে সাহায্য করা। ষষ্ঠত: ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়ন না করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া।

প্রসিত খীসা এবং তার তল্পিবাহক অনুগামীদের এহেন অনৈতিক কার্যকলাপ ও জুম্ম ধ্বংসের নীলনকশার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে অনেকে ইউপিডিএফ থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। সাচ্চা দেশপ্রেমিকরা কিছুতেই ইউপিডিএফ-এর এই জুম্মবিনাশী কর্মকান্ডে নিজেদেরকে জড়িত রাখতে পারেন না।

প্রসিত আর রবি শংকরের একগুঁয়েমির কারণে ইউপিডিএফ দলটি গঠনের প্রাক্কালে একটি বড় ধাক্কা খায় ইউপিডিএফ । প্রসিত আর রবি শংকরের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তৎকালীন পাহাড়ী গণ পরিষদের শীর্ষ নেতা সমীরণ চাকমা ইউপিডিএফ গঠন প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। অবিভক্ত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট করুণাময় চাকমা নতুন দল গঠন করা হঠকারী কাজ হবে বলে মতামত দেন। ভিন্নমতের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান ৯০ দশেকর তুখোড় ছাত্র নেতা নিকোলাস চাকমা। দল গঠনের মাত্র ৪ বছরের মধ্যে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে ব্যাপক মতভেদের কারণে দল থেকে পদত্যাগ করেন ইউপিডিএফ-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা দীপ্তি শংকর চাকমা।

একে একে পদত্যাগ করে দল ছাড়েন ইউপিডিএফ-এর অন্যতম সংগঠক অভিলাষ চাকমা, দীপায়ন খীসা এবং ইউপিডিএফ সমর্থিত তৎকালীন পিসিপি সভাপতি পরমেশ্বর চাকমা। এরপর প্রসিত আর রবি শংকরের সাথে ঠিকতে না পেরে সুইজারল্যান্ড পাড়ি জমান ইউপিডিএফ-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সঞ্চয় চাকমা। ইউপিডিএফ-এর ধ্বংসমুখী কর্মকাণ্ডের প্রতি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে দলত্যাগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অনিল চাকমা গোর্কি। পরবর্তীতে সমীরণ চাকমা, অনিল চাকমা গোর্কি, অভিলাষ চাকমা এবং দীপায়ন খীসা জনসংহতি সমিতির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। জনসংহতি সমিতির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে বর্তমানে দীপায়ন খীসা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ইউপিডিএফের সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দীর্ঘদিনের সভানেত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত পাহাড়ি অঞ্চলের বিশিষ্ট নারী নেত্রী কবিতা চাকমা’ এবং ইলোরা দেওয়ান ইউপিডিএফ-এর কার্যক্রমে হতাশা ব্যক্ত করে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। হিল উইমেন্স ফেডারেশনের আরেক নেত্রী ঢাকা শাখার সভানেত্রী মেকী খীসাও প্রসিত খীসার অন্যতম অনুগামী সমারী চাকমার সাথে তীব্র মতপার্থক্যের কারণে ইউপিডিএফ থেকে পদত্যাগ করেন। এভাবে ইউপিডিএফ দলটি একেবারে মেধাশূন্য হয়ে পড়ে।

আর ইউপিডিএফ-এর খতম নীতির শিকার হয়ে খুন হয়েছেন অনিল চাকমা গোর্কি এবং অভিলাষ চাকমা। (ইউপিডিএফ)-এর প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পর ২০১৮ সালের নভেম্বরে দলে আবার বড় ধরনের ভাঙ্গন দেখা দেয়। দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজির মতো নানা অভিযোগ ওঠে। এসব অসন্তোষ ও নেতৃত্বের বিরোধের জের ধরেই ইউপিডিএফ ভেঙে গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ গঠিত হয়। ইউপিডিএফ-এর প্রতিহিংসায় ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’ দলের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা (ওরফে বর্মা) ২০১৮ সালের ৪ মে রাঙামাটির নানিয়ারচরে ইউপিডিএফ-এর একদল দুর্বৃত্তের ব্রাশফায়ারে ৫ জন সহযোগীসহ নিহত হন।

সেই সাথে ইউপিডিএফ-এর জুম্ম বিধ্বংসী সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ছাত্র সমাজ দলটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চল সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেখানে জুম্ম ছাত্রছাত্রীরা অধ্যয়ন করছে কোথাও ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নাম-নিশানাও চোখে পড়েনা। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সহ শীর্ষস্থানীয় সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে অধ্যয়নরত পাহাড়ি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ইউপিডিএফ-এর কর্মী পাওয়া তো দূরের কথা, দু-একজন সমর্থকও খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ইউপিডিএফ পাহাড়ে অপহরণ বাণিজ্য ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে টিকে আছে। ইউপিডিএফ-এর শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও অপহরণ, চাঁদা উত্তোলন সহ নানান সমাজবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত। ইউপিডিএফ-এর নেতৃত্বে জাতি বিধ্বংসী কার্যকলাপের প্রতিবাদে, প্রসিত খীসা ও তার অনুগামী লম্পটদের বিরোধীতা করে দলটির ত্যাগী নেতা-কর্মীরা একে একে দলত্যাগ করা শুরু করেছেন। প্রসিত খীসার ষড়যন্ত্রের মায়াজালে আটকে না থেকে অনেকে সুপথে ফিরে এসেছেন। অনেকে প্রসিত খীসার দুষ্টচক্রের খপ্পর থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করছেন।