হিল ভয়েস, ৯ আগস্ট ২০২৬, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: “Honouring Indigenous Midwives: Safeguarding Life and Well-Being” — এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬’ পালিত হয়েছে।
আজ ৯ আগস্ট ২০২৬, রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীনস্ কমপ্লেক্স ভবনে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) রাজশাহী মহানগর শাখা, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ রাবি, গারো শিক্ষার্থী পরিবার রাবি এবং আদিবাসী স্টুডেন্টস্ অ্যাসোসিয়েশন অব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়—এই চার সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উত্তরীয় পরিধানের মাধ্যমে আলোচনা সভা শুরু হয়। পিসিপি রাজশাহী মহানগর শাখার সভাপতি সুমন চাকমার সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাবির প্রাক্তন ছাত্র উপদেষ্টা ও ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. আমীরুল ইসলাম কনক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো: গোলাম সারওয়ার এবং নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. অভিজিৎ রায়। এতে আরও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কালচারাল একাডেমির পরিচালক হরেন্দ্র নাথ সিং। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী উবাথোয়াই মারমা এবং স্বাগত বক্তব্য দেন শিক্ষার্থী ইন্দ্রজিৎ বেদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আমীরুল ইসলাম কনক বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্র পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জমি কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। কাপ্তাই বাঁধের ফলে লক্ষাধিক আদিবাসী গৃহহীন হয়ে ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য হলেও তাদের ফিরিয়ে আনার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো: গোলাম সারওয়ার বলেন, “আদিবাসীরা কখনো ঔপনিবেশিক শাসন মেনে নেয়নি, বরং ইতিহাসের বিখ্যাত আন্দোলনগুলোতে তারা নেতৃত্ব দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে তাদের বাঙালি পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তৎকালীন সাংসদ এমএন লারমা তা প্রত্যাখ্যান করে ওয়াক-আউট করেছিলেন।” তিনি পাহাড়ি ও সমতলের আদিবাসীদের নিজস্ব বৈষম্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ওপর জোর দেন।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. অভিজিৎ রায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রসার ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দেন।
অপরদিকে, বিভাগীয় কালচারাল একাডেমির পরিচালক হরেন্দ্র নাথ সিং বলেন, “অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। তাই আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন।”
আলোচনা সভায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রাজশাহীর সুভাষচন্দ্র হেমব্রম সমতলের আদিবাসীদের উচ্ছেদ, ইপিজেডের নামে ভূমি দখল ও হত্যার বিচার দাবি করেন।
এছাড়াও অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে আদিবাসী ছাত্র পরিষদের সভাপতি বিথী আক্কা, আদিবাসী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রিন্স হেমন্ত টুডু, গারো শিক্ষার্থী পরিবারের সভাপতি জেমস অর্ণব এবং পিসিপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শীত কুমার উঁরাং সাংবিধানিক স্বীকৃতি, মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরেন।
সভাপতির বক্তব্যে সুমন চাকমা পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি সভা থেকে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেন।
উত্থাপিত উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হলো:
১. আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং পাঠ্যপুস্তকে তাদের সঠিক ইতিহাস অন্তর্ভুক্তকরণ।
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন।
৩. জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র অনুস্বাক্ষর।
৪. পাহাড় ও সমতল আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা প্রদান এবং ধর্ষণের বিচার নিশ্চিতকরণ।
৫. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য কোটার আসন বৃদ্ধি, প্রতি হলে ৩-৪টি কক্ষ বরাদ্দ এবং টিএসসিসিতে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য রুম বরাদ্দ।
চার আদিবাসী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে উক্ত আলোচনা সভাটি শেষ হয়।