হিল ভয়েস, ১১ আগস্ট ২০২৬, ঢাকা: “বৈষম্য নিরসনে আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২৬, রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই আয়োজন করে।
বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য অনন্যা দ্রংয়ের সঞ্চালনায় এবং সংগঠনের সহ-সভাপতি ফ্লোরা বাবলি তালাংয়ের সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রাইটস এ্যান্ড গভর্নেন্স প্রোগ্রামের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ডের নাগরিকতা প্রজেক্টের ডেপুটি টীম লিডার ক্যাথরিনা কুনিগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া’র অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহা তানজিম তিতিল, এবং কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার উজ্জল আজিম প্রমুখ।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা। তিনি বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আদিবাসী নারীরা তাদের চিরায়ত জ্ঞান ও লোকজ সংস্কৃতি ধারণ ও সংরক্ষণ করে আসছেন। আদিবাসীদের জীবন ও কল্যাণ কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ভূমি, ভূখণ্ড, প্রাকৃতিক সম্পদ, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ সময় তিনি জাতিসংঘের আদিবাসী জনগণের অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন, আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের স্বীকৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ এবং আদিবাসী নারী ও সংগঠনসমূহে সরাসরি বিনিয়োগের দাবি জানান।
আলোচনা সভায় সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রাইটস এ্যান্ড গভর্নেন্স প্রোগ্রামের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, ভূমিকে ঘিরেই আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি পরিচালিত হয়। রাষ্ট্র এখনো আইএলও-১৬৯ অনুস্বাক্ষরকরণ থেকে বিরত রয়েছে এবং আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দানে দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। তিনি আদিবাসী তরুণ প্রজন্মসহ সকলকে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে অধিকারের পক্ষে কণ্ঠ জোরালো করার আহ্বান জানান।
কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার উজ্জ্বল আজিম বলেন, পাহাড় ও সমতলে আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতার মাত্রা বেড়েই চলেছে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য দীর্ঘদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের কোনো উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেনি।
সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ডের নাগরিকতা প্রজেক্টের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাথরিনা কুনিগ বলেন, আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান যুগ যুগ ধরে সংরক্ষিত হলেও আন্তর্জাতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তা যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। এই জ্ঞান প্রসার ও প্রচারে সিভিল সোসাইটিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহা তানজিম তিতিল বলেন, বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে সকলে অংশ নিলেও মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থান রাষ্ট্রকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা বিবেচনায় রেখে আদিবাসীদের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, বৈচিত্র্যতা রাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়, বরং তা রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সত্য মেনে নিয়ে মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, আদিবাসীরা প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে মিতালী করে জীবনযাপন করলেও প্রতিনিয়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। আদিবাসী নারী আন্দোলন ও মূলধারার আন্দোলনের মেলবন্ধনের মাধ্যমে অধিকার আদায় আরও জোরদার করা সম্ভব।
সভাপতির বক্তব্যে ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, আদিবাসীদের মানবাধিকার, ভূমি অধিকার ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘রেইনবো নেশন’ গঠন করতে পারে।
আলোচনা সভা শেষে ত্রিপুরা, ওরাঁও, হাজং, গারো ও বম সম্প্রদায়ের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ নৃত্য এবং আদিবাসী গানের দল “মাদল” ও “রিবেঙ”-এর পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।