হিল ভয়েস, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ঢাকা: ‘আত্ম-পরিচয়ের অধিকার আদিবাসীদের মানবাধিকার’—এই নীতি পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সম্প্রতি দেওয়া একটি বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও তা প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।
গত ১১ আগস্ট ২০২৬, ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি কর্মসূচিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ আদিবাসী নই’ মর্মে বক্তব্য দেন। ফোরামের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বক্তব্যকে ‘অনভিপ্রেত, অতীব দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের একজন উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে আরও সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত বক্তব্য প্রত্যাশা করে আদিবাসী জনগন। ফোরাম নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, ইতিপূর্বে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জাতীয় সংসদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক মাধ্যমে সংরক্ষিত রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের আন্তরিক সমর্থন দেখা যায়। ২০০৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রদত্ত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বাণীর কথাও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
আদিবাসী পরিচয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি ও মানদণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফোরাম জানায়, ২০০০ সালে জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরাম গঠন এবং ২০০৭ সালে আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণের সময় বিশ্বব্যাপী আদিবাসীদের ইচ্ছানুযায়ী একক কোনো সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি। কারণ, আত্ম-পরিচয় প্রকাশ করা মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
তবে জাতিসংঘের বিভিন্ন দলিল, স্পেশাল রেপোর্টিয়ার রিপোর্ট, এক্সপার্ট অপিনিয়ন, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯, ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইনডিজিনাস পপুলেশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানদন্ড ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাংলাদেশের আদিবাসীরা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ভূমির সাথে নিবিড় সম্পর্কের কারণে নিঃসন্দেহে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের অধিকারী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণে আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তা আংশিক বা বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে আদিবাসী ফোরাম।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আরো উল্লেখ করেছেন যে, “২০০৭ সালে জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া চারটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ২০০৯ এবং ২০১০ সালের মধ্যেই তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এ ঘোষণাপত্রে পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেছে। ২০০৭ সালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরোনো অবস্থান এখনও কেন ধরে রাখা হচ্ছে, তা বিস্ময়কর।”
সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থানকে সাধুবাদ জানালেও, ‘আদিবাসী’ শব্দ ও অস্তিত্ব সংক্রান্ত উক্তিটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।
বিজ্ঞপ্তির শেষাংশে দেশের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে এবং কাউকে পেছনে না ফেলে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী, সংবেদনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।