হিল ভয়েস, ১৮ আগস্ট ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার অবৈধ ও অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দিল্লি-এনসিআর-এ বসবাসরত চাকমা সম্প্রদায়ের সদস্যরা গতকাল, ১৭ আগস্ট ২০২৬, নয়াদিল্লির ভগবান বিরসা মুন্ডা ভবনে ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন করেন।
বক্তারা সমাবেশে জানান, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের হাতে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই, কারণ ওই অঞ্চলের জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশই ছিল অমুসলিম। ৩ জুন ১৯৪৭-এর মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা এবং ১৯৪৭ সালের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স অ্যাক্ট—উভয় ক্ষেত্রেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ববঙ্গ (পূর্ব পাকিস্তান)-এর জাতীয় সীমানার বাইরে রাখা হয়েছিল।
১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট মধ্যরাতে প্রায় ১০,০০০ চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের সদর দপ্তর রাঙামাটিতে ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনার কর্নেল জি. এল. হাইডের বাসভবনে জড়ো হন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতা উদযাপন করা। কিন্তু ডেপুটি কমিশনার তাদের সূর্যোদয়ের সময় আসতে বলেন। ফলে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সূর্যোদয়ের সময় হাজার হাজার চাকমা ডেপুটি কমিশনারের উপস্থিতিতে ফুটবল মাঠে প্রকাশ্যে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর তারা ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে মিছিল করে সরকারি পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ তখন ধরে নিয়েছিলেন যে তারা স্বাধীন ভারতের অংশ হয়ে গেছেন।
কিন্তু ১৭ আগস্ট ১৯৪৭ অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ঘোষণা করা হয় যে বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। মুক্তিযোদ্ধা স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে চাকমারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন এবং ভারত সরকারের সমর্থন আদায়ের জন্য স্নেহ কুমার চাকমাকে দিল্লিতে পাঠানো হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কোনো সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এদিকে রাঙামাটিতে ভারতীয় তেরঙ্গা পতাকা সাত দিন ধরে উড়তে থাকে। অবশেষে ২১ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এসে পতাকাটি নামিয়ে ফেলে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করে। অন্যদিকে ভারত তার সেনাবাহিনী পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। পূর্ব পাকিস্তান সরকার বৌদ্ধ সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার শুরু করে, এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অধীনেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই অত্যাচার অব্যাহত রয়েছে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।
চাকমা কালো দিবস পালন কমিটির আহ্বায়ক শ্রী পরিতোষ চাকমা বলেন, “২০১৬ সালে চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (CNCI) পূর্ব পাকিস্তানের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম হস্তান্তরের অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রতিবছর ১৭ আগস্ট ‘চাকমা কালো দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। চাকমারা এই দিনটিকে ‘পোরা হোবাল্যে দিন’ নামেও অভিহিত করেন, যার আক্ষরিক অর্থ ‘পোড়া কপালের দিন’। এখানে কপাল বলতে ভাগ্য বা ভবিষ্যৎকে বোঝানো হয়েছে। এখন ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট এই দিনেই চাকমা সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।”
দিল্লি চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি বিপুল চাকমা আক্ষেপ করে বলেন, “ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের আগে চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি আসাম, মিজোরাম ও ত্রিপুরাতেও বসবাস করত। কিন্তু র্যাডক্লিফ লাইন তাদের একটি অভিন্ন সম্প্রদায় হিসেবে না রেখে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত করে দেয় এবং চিরতরে সম্প্রদায়টিকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। চাকমাদের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়।”
দিল্লির পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন স্থানেও চাকমা কালো দিবস পালন করা হয়। এর মধ্যে ছিল মিজোরামের চাকমা অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (CADC) ও আইজল, আসামের গুয়াহাটি এবং ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
এছাড়া ‘চাঙমা র (Changmah Raw)’ সংবাদ চ্যানেলের উদ্যোগে একটি অনলাইন টক শো অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভারতীয় চাকমা সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শ্রী নিরুপম চাকমা—ন্যাশনাল কমিশন ফর শিডিউলড ট্রাইব-এর সাবেক সদস্য এবং বর্তমানে চাকমা অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের (CADC) চিফ এক্সিকিউটিভ মেম্বার; মিজোরামের বিধানসভা সদস্য শ্রীমতী প্রভা চাকমা ও শ্রী রসিক মোহন চাকমা; ত্রিপুরার বিধানসভা সদস্য শ্রী শম্ভুলাল চাকমা; ত্রিপুরার চাকমা সম্প্রদায়ের সমাজপতি/প্রধান শ্রী শান্তি বিকাশ চাকমা; লেখক ও সমাজকর্মী শ্রী পরিতোষ চাকমা এবং গুয়াহাটির স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার জেনারেল ম্যানেজার শ্রী আশুতোষ চাকমা।
বক্তারা ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতি সংঘটিত ঐতিহাসিক অবিচার নিয়ে আলোচনা করেন এবং বাংলাদেশ ও ভারত-উভয় দেশে চাকমা সম্প্রদায়ের মুখোমুখি হওয়া বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে চাকমা জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
[সূত্র: প্রেস রিলিজ]