হিল ভয়েস, ১৮ আগস্ট ২০২৬, শেরপুর: আজ ১৮ আগস্ট, মঙ্গলবার শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পূর্ব গজারীকুড়া এবং বন্দধারা গ্রামে গারো জনগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রদায়িক ও বর্বরোচিত হামলা এবং ব্যাপক লুটপাটের প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মানববন্ধনে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক হ্লামংচিং মারমা, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস) এর ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক সৃজন মৃ, হামলার ভুক্তভোগী নিলু চাম্বুগং, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক রিয়া চাকমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অনন্ত তঞ্চঙ্গ্যা, গারো ছাত্র ফেডারেশন এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিয়ন রিছিল, আদিবাসী অধিকারকর্মী অলিক মৃ, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সভাপতি ফাল্গুনী ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক ডা. গজেন্দ্রনাথ মাহাতো ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সমন্বয়কারী জাকির হোসেন।

স্বাগত বক্তব্যে মনিরা ত্রিপুরা বলেন, একজন ব্যক্তির মৃত্যুর দায় কোনো ব্যক্তি বা সম্পূর্ণ একটি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত বিল্লাল হোসেনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ আরোপ করে তার জেরে একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর বসতিতে হামলা চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার তদন্ত ও বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সন্দেহ, অনুমান বা গুজবের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে দায়ী করে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
হামলার ভুক্তভোগী নিলু চাম্বুগং বলেন, আমাদের গ্রামে যে লুটপাট হয়েছে, তা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী যেভাবে বাংলাদেশে লুটপাট চালিয়েছিল, সেই ভয়াবহতাকেই মনে করিয়ে দেয়। আমরা এখনো চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। হামলার পরও আমাদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, অবিলম্বে এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
দীপায়ন খীসা বলেন, গারো আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামে হামলার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন ব্যক্তিকে কে বা কারা হত্যা করেছে, তার দায় কোনোভাবেই পুরো একটি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো যায় না।
তিনি বলেন, এই সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই আদিবাসীদের নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করে যাচ্ছে। তারা ‘রেইনবো নেশন’-এর কথা বলেছেন। কিন্তু আদিবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করে কখনোই রেইনবো নেশন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দেশে নাকি কোনো আদিবাসী নেই, সবাই অধিবাসী। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। দেশে আদিবাসী আছে কি নেই—এ বিষয়ে নৃবিজ্ঞানীর মতো মন্তব্য করা তাঁর দায়িত্ব নয়। তিনি যখন ‘অধিবাসী’দের কথা বলছেন, তখন সেই অধিবাসীদেরও নিরাপত্তা দিতে পারছেন না।
সভাপতির বক্তব্যে সমতল আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক উজ্জল আজিম বলেন, মৃত বিল্লাল হোসেনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও বিচার অবশ্যই হতে হবে। একইভাবে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি কোনো নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়ে থাকে, সেসব ঘটনারও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি—মৃত বিল্লাল হোসেনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এবং গারো গ্রামে হামলার অভিযোগ—দুই বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে এবং কোনো ধরনের জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক পক্ষপাত ছাড়াই দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
মানববন্ধনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত দাবি জানানো হয়—
১. গারো গ্রামে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগেরও পৃথক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
২. হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গারো পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. মৃত বিল্লালের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে।
৪. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করে তাদের প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. হামলায় আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরপরাধ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের আইনি সহায়তাসহ অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
৬. ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে পুনরায় না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৭. স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরপেক্ষ, দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা পালন করতে হবে।