হিল ভয়েস, ২২ আগস্ট ২০২৬, রাঙামাটি: রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা ইউনিয়নের তুলাবান এলাকায় স্থানীয় ধর্মীয় গুরু, শিক্ষক, অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ(পিসিপি) বাঘাইছড়ি থানা শাখার নেতৃত্বে এক সচেতনামূলক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গতকাল ২১ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার সকাল ৯ ঘটিকার সময়ে তুলাবান নবরত্ন বৌদ্ধ বিহারে এ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
পিসিপি বাঘাইছড়ি থানা শাখার সহ-সভাপতি উদ্দীপন চাকমার সঞ্চালনায় এবং সংগঠনের সভাপতি চিবরন চাকমার সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সভাপতি পুলকজ্যোতি চাকমা।
এছাড়া সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তুলাবান নবরত্ন বৌদ্ধ বিহারের সম্মানিত বিহারাধ্যক্ষ আর্য্যকীর্তি মহাথের ভিক্ষু, প্রত্যাগত জেএসএস সদস্য ও বর্তমান জনসংহতি সমিতি বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সদস্য জ্যোতিষ্মান চাকমা, মারিশ্যা ইউনিয়নের ইউ.পি চেয়ারম্যান আপন চাকমা, তুলাবান উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রধান শিক্ষক জ্ঞান রঞ্জন চাকমা প্রমূখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলকজ্যোতি চাকমা বলেন, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনামলে একসময় ব্রিটিশরা ভারতীয়দের মাদকাসক্ত করে তাদের সম্পত্তি লুটপাট চালিয়েছিল। আজকে একই বাস্তবতা আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের মধ্যেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। আজকে শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে আমাদের মূল্যবান সম্পদ, আমাদের মূল্যবান ভবিষ্যৎ, আমাদের আগামী প্রজন্মকে মাদকাসক্ত করে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, মনীষীরা বলে গেছেন, “কোনো একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে সেই জাতির যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল গ্রাসে নিমজ্জিত করে রাখুন।” কারণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে একজন মানুষ ধীরে ধীরে তার পরিবার, সমাজ ও জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে এবং নৈতিক ও সামাজিকভাবে অধঃপতনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যায়।
তিনি আরও বলেন, আজকে এখানে আমাদের সমাজের ধর্মীয়গুরু থেকে শুরু করে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ উপস্থিত রয়েছে। আমরা আশাবাদী, আমাদের প্রত্যেকে নিজেদের অবস্থান থেকে যদি প্রচেষ্টা জারি রাখি তাহলে অবশ্যই আমাদের প্রজন্মকে আমরা ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হবো।
বিহারাধ্যক্ষ আর্য্যকীর্তি ভিক্ষু বলেন, একটি মানুষের মানবিক মূল্যবোধ নিহিত থাকে পঞ্চশীল পালনের মাধ্যমে। যিনি প্রকৃত বৌদ্ধ, তিনি পঞ্চশীলের ৫টি নিয়ম যথাযথভাবে মেনে চলার চেষ্টা করবে। এবং সেই নিয়মগুলো অনুসরণ করলে তার উপর আর কোন অজ্ঞানতা ভর করতে পারে না। তিনি নিজের এবং অপরের ক্ষতি হয় এমন কোন কর্ম করা থেকে সর্বদা বিরত থাকেন।
তিনি বলেন, মাদকাসক্তি জিনিসটা একদিনে হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনা, এটি ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। একটা পর্যায়ে গিয়ে সে নিজেকে যেমনি চিনে না, তেমনি সে পরিবার-সমাজও চিনে না।
তিনি আরও বলেন, এটা হঠাৎ করে পরিবর্তন আসবে না। ধাপে ধাপে এর বিরুদ্ধে আমাদের সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরও নিয়মিতভাবে, অন্তত সাপ্তাহিক অন্তর, তাদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করতে হবে।
চেয়ারম্যান আপন চাকমা বলেন, সমাজের নানা অসঙ্গতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আমরা অনেকেই অনেক কথা বলি—এটা করব, সেটা করব বলে নানা পরিকল্পনা করি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এসব পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির অধিকাংশেরই কার্যকর কোনো বাস্তবায়ন নেই।
তিনি স্থানীয় যুব সমাজের প্রতি আহ্বান রেখে বলেন, একমাত্র যুব সমাজই পারে আমাদের সমাজ ও জাতির বিকাশের ধারাকে সচল ও গতিশীল রাখতে। তাই আসুন, সমাজের এসব অসঙ্গতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে যা যা করণীয়, সেসব বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করি এবং সেই পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ হাতে নিই।
জ্ঞানরঞ্জন চাকমা বলেন, আমাদের সমাজব্যবস্থায় যুব সমাজের দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদেরকে ডেডিকেটেড হতে হবে। কোনো ধরনের পিছুটান, ভয়-ভীতি বা দ্বিধা রাখা চলবে না। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা নির্ভয়ে ও দৃঢ়তার সঙ্গে করে যেতে হবে। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না।
জ্যোতিষ্মান চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অনেকেই আজ যেন ভুলে গেছেন। মাঝেমধ্যে আমাদেরই তাদের সেই চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হয়—এটি মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। যে চুক্তিকে ঘিরে এত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, এত রক্ত ঝরেছে, সেই চুক্তিকে আজ অবমূল্যায়ন করে অকেজো করে রাখা হয়েছে। এর পরিণতির জন্য রাষ্ট্রকে যেকোনো সময় চরম মাশুল দিতে হতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
পরবর্তীতে সভার সভাপতি চিবরন চাকমার সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে মতবিনিময় সভাটি সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ বাঘাইছড়ি থানা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রুপেশ চাকমা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম
August 22, 2026