Tuesday, 22 Sep 2026
আদিবাসী অধিকার August 27, 2026

আদিবাসী বিরোধীতার নামে জাতিগত বিদ্বেষ, হিংসা ও মিথ্যাচার

হিল ভয়েস, ২৫ আগস্ট ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদক: প্রতিবছরের ন্যায় এবারেও পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করার চেষ্টা করেছে। এইসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আদিবাসীরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে যেমন তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, তেমনি সভা, সমাবেশ, শোভাযাত্রা আয়োজনের মাধ্যমে আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন, আদিবাসীদের ভূমি ও ভূখন্ডের অধিকার নিশ্চিতকরণ, জাতিগত অস্তিত্ব সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।

কিন্তু আদিবাসীদের এইসব কর্মসূচির পাশাপাশি মুসলিম বাঙালিদের একটি অংশ কর্তৃক আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি ও আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে কাউন্টার কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে। এইসব কর্মসূচিতে আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিকে বিরোধীতার নামে প্রকৃতপক্ষে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক জাতিগত বিদ্বেষ, হিংসা ও মিথ্যাচার ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে বৃহৎ বাঙালি জনগোষ্ঠীর অন্যায় আধিপত্যবাদী ও উগ্রজাতীয়তাবাদী মনোভাবই উন্মোচিত হয়েছে।

আদিবাসী স্বীকৃতির দাবির বিরোধীতাকারী এইসব মহলের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধভাবে অনপ্রবেশকারী সেটেলার বাঙালিদের সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন সংগঠনসমূহ যেমন রয়েছে, তেমনি উদ্বেগজনকভাবে এইসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন বর্তমান সরকারের দুইজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তি, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ও ছাত্র। এই ধরনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এই ধরনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ও সমর্থন আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি ও নিরাপত্তাকে আরো ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেবে বলে বিবেচনা করা যায়।

নিম্নে কিছু উদাহরণ সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হল-

সেটেলার বাঙালি সংগঠন: আদিবাসী দিবসের নির্দিষ্ট দিনের আগেই ৬ আগস্ট ২০২৬ পার্বত্য চট্টগ্রামের সেটেলার বাঙালিরা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ, ঢাকা মহানগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা’র ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য প্রাঙ্গণে ‘আদিবাসী স্বীকৃতির আড়ালে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ বিরোধী ষড়যন্ত্র’এর বানোয়াট অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানে সেটেলার নেতাদের পাশাপাশি সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান ও উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠন ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’র আহ্বায়ক জিয়াউল হক উপস্থিত থেকে আদিবাসী ও পার্বত্য চুক্তি বিরোধী বক্তব্য রাখেন। এই সমাবেশে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বয়ান হাজির করে বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা এদেশের ভূমি সন্তান বা আদি বাসিন্দা নয়।

৯ আগস্ট ২০২৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পায়রা চত্বরে ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’র উদ্যোগে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এই আলোচনা সভায় ‘বাংলাদেশে বাঙালিরাই আদিবাসী এবং বিদেশি মদদে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের উপর আদিবাসী দাবি চাপিয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার, খ্রিস্টান রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে’ বলে উল্লেখ করা হয়। একইদিন, ঢাকার শাহবাগে ‘মাতৃভূমি সুরক্ষা আন্দোলন’ এর ব্যানারে তথাকথিত ‘বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আদিবাসী স্বীকৃতির দাবির আড়ালে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ’ আয়োজন করা হয়।

১০ আগস্ট ২০২৬ সেটেলার বাঙালিদের সংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ’র উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ‘আদিবাসী স্বীকৃতির আড়ালে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র’ করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ঐতিহাসিক অধিকারের স্মারক ‘১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি’ বাতিলের দাবি করা হয়। দেশের সাধারণ বাঙালিদের বিভ্রান্ত করতে এবং জাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে দাবি করা হয়, আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না, উপজাতিরা আলাদা মানচিত্র করতে পারবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের ঢাকায় আসতে হলে পাসপোর্ট দিয়ে আসতে হবে।

সরকারি দলের মন্ত্রী ও নেতাদের অংশগ্রহণে আদিবাসী বিরোধী গোল টেবিল বৈঠক: ১১ আগস্ট ২০২৬ ঢাকার গুলশান-২ এ অবস্থিত ক্রাউন প্লাজা হোটেলে তথাকথিত ‘সিএইচটি রিচার্স ফাউন্ডেশন’এর ব্যানারে ‘আদিবাসী পরিচয় বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গোল টেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সিএইচটি রিচার্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘পার্বত্যনিউজ’এর সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন আহমেদ স্বপন ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। এছাড়া এই অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারি দল বিএনপির অনেক নেতাকর্মী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সেটেলার সংগঠন ও অন্যান্য সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীও উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশে আদিবাসীদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বলেন, দেশে কোনো আদিবাসী গোষ্ঠী নেই, বরং সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী। অপরদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন আহমেদ স্বপন বলেন, আদিবাসী পরিচয় আন্তর্জাতিকভাবে বিকাশ লাভ করেছে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে না। একই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চীফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অধিকার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

পৃথিবীর কোথাও নেই: ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ১৪৪টি রাষ্ট্রের ভোটে বিপুল সংখ্যাগষ্টিতা নিয়ে ‘জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়। এতে মাত্র চারটি দেশ, যেমন- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র এর বিপক্ষে ভোট দেয়। অপরদিকে বাংলাদেশ, আজারবাইজান, ভুটান, বুরুন্ডি, কলম্বিয়া, জর্জিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, রাশিয়ান ফেডারেশন, সামোয়া ও ইউক্রেন-এই ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে। তবে, যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় তারা পরবর্তীকালে আদিবাসী ঘোষণাপ্রত্র বিষয়ে নিজেরাই অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় ব্যাপার হল, পৃথিবীর কোথাও বাংলাদেশের মত সরকারিভাবে এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর লোকজন কর্তৃক আদিবাসী স্বীকৃতির বিরুদ্ধে এত বিদ্বেষ, মিথ্যা বয়ান, বৈরী আচরণ প্রদর্শন করা হয় না। আদিবাসী দিবস আসলে সেখানে কোথাও আদিবাসী বিরোধী বিক্ষোভ দেখা যায় না। এমনকি ভোটদানে বিরত থাকা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আদিবাসী বিরোধী কোনো কর্মসূচি দেখা যায় না। পৃথিবীর একমাত্র দেশ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই তা দেখা যায়।

আরও উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে আদিবাসী বিরোধীদের যে বক্তব্য- ‘আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে’-এই দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায় না। কারণ আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র সমর্থনকারী কোনো দেশে এপর্যন্ত সার্বভৌমত্ব ক্ষূণ্ন হতে বা আদিবাসীরা বিচ্ছিন্ন হতে দেখা যায়নি।

বস্তুত আদিবাসীদের উপর যুগ যুগ ধরে চলমান যে অন্যায়-অবিচার সেটা ধামাচাপা দিতে এবং আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করার লক্ষ্যেই সাম্প্রদায়িক ও উগ্র মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী আদিবাসীদের স্বীকৃতি, প্রকৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে চলেছে, যা সততাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বলে বিবেচনা করা যায় না।