জিকো চাকমা
পার্বত্য চট্টগ্রামকে শুধু তিনটি জেলা হিসেবে দেখলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি বাংলাদেশের এমন একটি ভূখণ্ড, যার সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাস সংঘাত, সামরিকীকরণ, ভূমি প্রশ্ন, জাতিগত পরিচয়, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের দলিল ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। তাই ২৭ আগস্ট মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলার আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাকে নিছক প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। প্রশ্ন হলো, সেই বার্তাটি কী?
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়েছিল একটি দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে। চুক্তির অন্যতম মৌলিক দর্শন ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে স্বীকার করা এবং ধীরে ধীরে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক গঠিত আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। চুক্তির ১৭ নম্বর ধারায় অস্থায়ী সকল সেনা ক্যাম্প, আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানকার বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তির কাঠামোটি ছিল পাহাড়ে স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ধীরে ধীরে বেসামরিকরণ ও সেখানকার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গনতান্ত্রিকভাবে শক্তিশালী করা।
কিন্তু প্রায় তিন দশক পরও সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। বিগত সময়ে জাতিসংঘের একটি বিশ্লেষণেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক উপস্থিতি, বেসামরিক প্রশাসনের ওপর সামরিক প্রভাব এবং অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের বিষয়টিকে চুক্তি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেখানে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা কমিয়ে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে স্বাভাবিক প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
একদিকে বর্তমান সরকার বলছে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের রাজনৈতিক সমস্যাকে সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নয়, রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এই দ্বন্দ্বটি যদি সরকার উপলব্ধি না করে, তাহলে যত উন্নয়নই হোক, যত প্রশাসনিক পদক্ষেপই নেওয়া হোক, পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সমস্যা কমবে না। বরং বাড়বে।
পাহাড়ে সামরিকীকরণের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
পার্বত্য চট্টগ্রামে অতিমাত্রায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিছক নিরাপত্তার প্রশ্নে নয় বলে মনে করি। বাংলাদেশ সরকারের যুক্তি হচ্ছে, পাহাড়ের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি প্রয়োজন। এই যুক্তিকে একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়েও সরকার ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকার কথা বলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও অস্বীকার করা যাবে না। চুক্তির প্রায় ২৯ বছর পরও অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার, বেসামরিক প্রশাসনের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং চুক্তি অনুযায়ী আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোর কার্যকর ক্ষমতায়নের প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক প্রভাবকে এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে মূল বিষয় সেনাবাহিনীকে ভালো বা খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও কেন একটি বিশেষ রাজনৈতিক অঞ্চলের স্বাভাবিক বেসামরিক প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি কার্যকর হয়ে উঠবে না? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতেই হবে।
মীর হেলালের দায়িত্ব সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে
এই বাস্তবতায় তিন পার্বত্য জেলার আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্ব একজন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত করার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দেবে। বিশেষ করে যখন সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সংশ্লিষ্টতাও কখনো ছিল না, এখনো নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য যখন একটি পৃথক মন্ত্রণালয় রয়েছে, একটি আঞ্চলিক পরিষদ রয়েছে, তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ রয়েছে এবং ১৯৯৭ সালের চুক্তি এসব প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ ভূমিকা দিয়েছে, তখন তিন জেলার ওপর কেন্দ্রীয়ভাবে আরেকটি রাজনৈতিক-প্রশাসনিক তদারকি কাঠামো তৈরি করার অর্থ কী? এটি কি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক গঠিত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার অংশ? নিশ্চয় নয়। যদি সেটা নাহয়, তবে সেটা হতে পারে আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশ কাটিয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের উচিত এই বিষয়গুলোর ওপর সৃষ্ট ধোঁয়াশা ও উদ্বেগগুলো পরিষ্কার করা। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও সবসময়ের জন্য রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। অন্ততপক্ষে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সাচিংপ্রু জেরীকে তিন পার্বত্য জেলার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। কিন্তু সেটা না করে মীর হেলালকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যার কারণে পাহাড়ের মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নীতিনির্ধারণে পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, চুক্তি অনুযায়ী ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদকে কার্যকর করা, স্থানীয় প্রশাসনে অংশগ্রহণ, সামরিকীকরণ কমানো এবং নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি। এসব দাবি নতুন নয়। এসবের পেছনে কয়েক দশকের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ঢাকা থেকে যখন একের পর এক সিদ্ধান্ত আসে, আর পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তের কোনো দৃশ্যমান সামঞ্জস্য থাকে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই অবিশ্বাসকে অবহেলা করা সুখকর নয়। কারণ একটি জনগোষ্ঠী যখন বারবার অনুভব করতে শুরু করে যে তার কথা শোনা হচ্ছে না, তখন রাষ্ট্রের প্রতি গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়। আর আস্থার সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হয়। নিকট অতীতে আমরা দেখেছি। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই আশঙ্কাটিই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
ঢাকা কি পাহাড়ের ভাষা শুনছে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কাছ থেকে অনেকে ভিন্ন ধরনের নীতি আশা করেছিলেন। তথাকথিত ‘রেইনবো নেশন’-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের যে রাজনৈতিক ধারণা বিএনপি সামনে এনেছিল, তার স্বাভাবিক অর্থ হওয়া উচিত ছিল বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে ন্যায্য অংশীদারিত্ব। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের সাথে বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক আমরা লক্ষ্য করছি। যার কারণে দেশের জনমানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে সেই হতাশা আরও সংবেদনশীল। কারণ এখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অতীত ইতিহাস অন্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। একদিকে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। অন্যদিকে রয়েছে চুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন। রয়েছে ভূমি বিরোধ। রয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্ষমতার প্রশ্ন। রয়েছে সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব। রয়েছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা। রয়েছে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস। এই সবগুলো বিষয়কে আলাদা আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। এগুলো পাহাড়ের একই রাজনৈতিক সংকটের বিভিন্ন দিক।
সংঘাতের দিকে যাওয়ার আগে রাজনৈতিক সমাধানের পথে ফিরতে হবে
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি যদি রাজনৈতিকভাবে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা না হয়, তাহলে একটি অনিশ্চিত সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এটি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং নিকট অতীত থেকে নেওয়া সতর্কবার্তা। পার্বত্য চট্টগ্রামে একসময় দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাত হয়েছে। সেই সংঘাতের সাময়িক অবসান হয়েছিল সামরিক বাহিনীর বিজয়ের মাধ্যমে নয়, একটি রাজনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে। সুতরাং আজ যদি আবারও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর মাধ্যমে খোঁজা হয়, তাহলে সেটি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির মূল দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হয়ে উঠবে। সরকারের সামনে তাই কঠিন কিন্তু পরিষ্কার একটি পথ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখবে, নাকি রাজনৈতিক সমাধানের বিষয় হিসেবে দেখবে? দুটির মধ্যে পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা প্রয়োজন, কিন্তু শুধু নিরাপত্তা দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করা যায় না। সেনাবাহিনী প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা করবে, কিন্তু একটি বিশেষ রাজনৈতিক অঞ্চলের স্বাভাবিক প্রশাসন, ভূমি বিরোধ, স্থানীয় সরকার, জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কিংবা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এসবের সমাধান করতে হয় রাজনীতির মাধ্যমে।
ঠিক এই জায়গাতেই বিএনপি সরকারের সামনে একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতা থেকে নিজেদের আলাদা করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়বদ্ধ রোডম্যাপ দিতে পারে। আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্ষমতা কার্যকর করতে পারে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করতে পারে। অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্বচ্ছ নীতি দিতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ের সব জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক সংলাপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। এতে শুধু জুম্ম জনগোষ্ঠীর আস্থা ফিরবে না, রাষ্ট্রও লাভবান হবে। কারণ শান্তিপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু পাহাড়ের মানুষের প্রয়োজন নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থেরও বিষয়।
অন্যদিকে, যদি পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা হয়, যদি সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ে এবং যদি চুক্তি বাস্তবায়নের বদলে আইনশৃঙ্খলাকেই প্রধান সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা হয়তো এখনো সেই সংকেতগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। কিন্তু পাহাড়ে মানুষের হতাশা, ক্ষোভ ও অবিশ্বাস জমতে থাকলে তার রাজনৈতিক মূল্য একসময় পুরো রাষ্ট্রকেই দিতে হতে পারে। তাই জনাব মীর হেলালকে তিন পার্বত্য জেলার দায়িত্ব দেওয়ার প্রশ্নটি কেবল একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টনের প্রশ্ন নয়। এটি আরও বড় একটি প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশে সরকার কি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে করতে চায়, নাকি আগের সরকারগুলোর মতোই পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেবল প্রশাসনিক ও নিরাপত্তার কাঠামোর মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ করতে চায়? বিএনপি সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপই সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে। আর পাহাড়ের মানুষ এখন সেই উত্তরটির অপেক্ষায়।
জিকো চাকমা: সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ