Tuesday, 22 Sep 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম September 12, 2026

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে ছাত্র সমাজকে অধিকতর সামিল হতে হবে: পিসিপির কাউখালী শাখা সম্মেলনে বক্তারা

হিল ভয়েস, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাঙ্গামাটি: “সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হউন”— এই স্লোগানকে সামনে রেখে পার্বত্য পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর কাউখালী থানা শাখার ১৯তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, উক্ত সম্মেলন ও কাউন্সিল-২০২৬ সম্পন্ন হয়।

সম্মেলন ও কাউন্সিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কাউখালী থানা কমিটির সভাপতি হ্লাচিমং মারমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির কাউখালী থানা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক নিপুন চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা, পিসিপির রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ম্যাগলিন চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এলি চাকমা প্রমুখ।

সম্মেলনের সূচনালগ্নে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। কাউখালী থানা শাখার সহ-সভাপতি রসিক তঞ্চঙ্গ্যার সভাপতিত্বে এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক সঞ্চয় তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন থানা শাখার সদস্য সৈকত চাকমা।

প্রধান অতিথি হ্লাচিমং মারমা বলেন, স্মরণাতীত কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যার শিকার হয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ডজনেরও অধিক গণহত্যা হয়েছিলো। সেই গণহত্যা গুলোর মধ্যে প্রথম ১৯৮০ সালে ২৫ মার্চ কাউখালীর কমলপতি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো। কিভাবে জুম্ম জনগণকে হত্যা করা হয়েছিলো আমরা কখনো ভুলতে পারি না এবং ভুলবো না। তাই শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে, জুম্ম জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

নিপুন চাকমা বলেন, একটি জাতি বা সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্র-যুব সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। একদিকে শাসকগোষ্ঠীর অপশাসন, অন্যদিকে সমাজের নানা প্রতিক্রিয়াশীল সুবিধাবাদী চরিত্রের মানুষের বসবাস। এই সবকিছু ছাত্র-যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোকাবেলা করতে হবে। সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখার জন্য ছাত্র-যুব সমাজকে মাদকাসক্তি থেকে বিরত থেকে সমাজের ছাত্র-যুবকদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, শাসকগোষ্ঠী পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে সামরিক উপায়ে শাসন জারি রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প দ্বারা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। সেই সেনাক্যাম্পগুলো চুক্তির পর প্রত্যাহার করার কথা থাকলেও চুক্তির এত বছর পেরিয়ে গেলেও জুম্ম জনগণ এখনো সেনা ছাউনি থেকে মুক্ত হতে পারেনি। প্রতিনিয়ত সেনাবাহিনীর নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হওয়ার মাধ্যমে জুম্ম জনগণের মাঝে ভয়ের সংস্কৃতি জিইয়ে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যেভাবে ব্রিটিশরা ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ চালিয়েছিলো সেভাবে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঔপনিবেশিক কায়দায় শাসন-শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির জন্য, জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এম এন লারমা ঘুণেধরা সমাজ ব্যবস্থার উপর আঘাত করে ঘুমন্ত জুম্ম জনগণকে জাগিয়ে তুলে আন্দোলন সংগ্রামের বীজ বপন করেছিলেন। বিজাতীয় শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য এম এন লারমা যে আন্দোলন শুরু করেছেন, ছাত্র সমাজকে সে আন্দোলন সংগ্রামে অধিকতরভাবে সামিল হতে হবে।

ম্যাগলিন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস হলো শাসন-শোষণের ইতিহাস। ব্রিটিশ আমল হতে বর্তমান পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসন-শোষণই হয়ে আসছে। দেশ ভাগের পরেও পাকিস্তানের শোষণ-শাসনে আবদ্ধে ছিলো পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণের ৫৪ হাজার একর ধান্য জমি পানিতে তলিয়ে যায়। লক্ষাধিক জুম্ম জনগণকে নিজ ভিটামাটি থেকে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে, শরণার্থী জীবনযাপন কাটাতে হয়েছে। একের পর এক কার্যক্রমের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব মুছে দিতে নানাভাবে তখন থেকে ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও জুম্ম জনগণ সেই শাসন-শোষণের কবল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। জুম্ম জাতির অস্তিত্ব বিলীন করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধভাবে রাবার কোম্পানির নামে, উন্নয়নের নামে ভূমি বেদখলসহ জুম্ম জাতি গোষ্ঠীকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে।

এলি চাকমা বলেন, স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত করে বাংলাদেশে বিএনপি নতুন সরকার গঠন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো আন্তরিকতা জুম্ম জনগণ দেখতে পায়নি। বরং চুক্তিকে লঙ্ঘন করে বর্তমান সরকার নানা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। চুক্তির এত বছর পরেও মৌলিক বিষয়গুলো সরকার বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তাই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের জাতি ও অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্র সমাজকে সচেতন থাকতে হবে।

সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে আর্য্য চাকমা-কে সভাপতি, সৈকত চাকমা-কে সাধারণ সম্পাদক এবং সুজয় মারমা-কে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট কাউখালী থানা শাখা কমিটি গঠন করা হয়।

নবনির্বাচিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুনীতি বিকাশ চাকমা।