Tuesday, 22 Sep 2026
মতামত September 15, 2026

বাংলাদেশে জাতি সমস্যা এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার চিন্তাধারা

সজীব চাকমা

১. ভূমিকা

সামন্ততন্ত্র ধ্বংস ও পুঁজিবাদের বিকাশের যুগে পশ্চিম ইউরোপে কয়েকটি মাত্র দেশে প্রথমে জনগণ একটি জাতি হিসেবে সংগঠিত হয়ে জাতিরাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু পরবর্তী কাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বে যত রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে সবগুলি বহুজাতি ভিত্তিক রাষ্ট্র। পূর্বের একক জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রগুলিও পরবর্তীতে বহুজাতি ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সুশাসনের অভাব, শোষণ ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কারণে অধিকাংশ বহুজাতি ভিত্তিক রাষ্ট্রগুলিতে জন্ম থেকে দেখা দেয় বিভিন্ন জাতিগুলির মধ্যে জাতি সমস্যা, জাতি বৈষম্য, জাতিবিদ্বেষ, নিপীড়ন ইত্যাদি। এই সমস্যা সমাধান নিয়েও তাই নানা উপায়, তত্ত্ব জন্ম নিয়েছে। এই জাতি সমস্যা বা এক জাতি আরেক জাতির উপর আধিপত্য, নিপীড়ন ও অত্যাচারের কারণে এক রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্রও সৃষ্টি হয়েছে অনেক। সর্বশেষ কয়েক বছর আগে আমরা পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের কথা জানি।

আধুনিক কালে জাতিগত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, মূলত সাম্রাজ্যবাদী, সম্প্রসারণবাদী বা আধিপত্যবাদী দেশ ও গোষ্ঠীগুলো কর্তৃক নিজেদের পুঁজিবাজার সৃষ্টি, শিল্পকারখানার জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ, সস্তায় শ্রম ক্রয়, শোষণ, লুটপাটের জন্য পররাজ্য গ্রাস, অপর জাতির মানুষকে পদানতকরণ, দমন-পীড়ন ও অধিকার হরণ করার মধ্য দিয়ে। আর এর কিয়দংশ সমাধান হয়েছে, সেইসব পদানত জাতি ও রাজ্যগুলোর জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে। তবে সেখানেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়নি। অচিরেই দেখা যায়, সেই স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশের বা জাতিগুলির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ট বা প্রবল জাতির শাসক ও কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক সাম্রাজ্যবাদীদের ন্যায় নিজের দেশেরই অভ্যন্তরে স্বতন্ত্র ও সংখ্যালঘু জাতিগুলোর উপর আগ্রাসন, শোষণ, নিপীড়ন, উৎখাত, দমন-পীড়ন, বঞ্চনা চাপিয়ে দেওয়ায় আবারও নতুন করে দেশে দেশে জাতিগত সমস্যা দানা বাঁধে। বস্তুত এক জাতি কর্তৃক আরেক জাতির উপর বৈষম্য, তাদের অধিকারকে অস্বীকার, অস্বীকৃতি, অমর্যাদা তথা বৃহৎ জাতির শাসক-শোষক ও কায়েমি স্বার্থবাদীদের কর্তৃক সংখ্যালঘু ভিন্ন জাতির মানুষকে শাসন-শোষণ, দমন-নিপীড়ন, নিয়ন্ত্রণ থেকেই জাতি সমস্যার সৃষ্টি। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক উভয় ধারার উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশে এই জাতি সমস্যা অনেকাংশে সমাধান বা প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু বেশ কিছু উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে এই জাতি সমস্যা এখনো প্রকটভাবে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশি রাষ্ট্র মিয়ানমারে এই সমস্যা এখন জটিলাকার ও সহিংস রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ সমতলের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসমূহ এর অন্যতম প্রধান শিকার। এর ফল হল- হয় শোষণ, বঞ্চনা ও আগ্রাসনকে বরণ করে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হও, নয়তো প্রতিরোধ সংগ্রাম করার চেষ্টা করো এবং জাতীয় নিপীড়নকে মোকাবিলা করো- এমনই অবস্থা।

২. বাংলাদেশে জাতি সমস্যার স্বরূপ

বাংলাদেশও ঐতিহাসিকভাবে বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি ও বহু জাতির এক আবাসভূমি। মাত্র ১৯৭১ সালে এটি স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আবির্ভূত হলেও এই ভূখন্ডের নানা অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে কিংবা স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করে আসছিলেন সংখ্যাগরিষ্ট বাঙালি জাতি ছাড়াও সংখ্যালঘু নানা জাতি বা জাতিসত্তার মানুষ। এখানে বাঙালি জাতির মানুষ সংখ্যাগরিষ্ট (প্রায় ৯৯%) হলেও বাঙালি জাতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভিন্ন জাতির সংখ্যা ৫৪টির অধিক, যারা আদিবাসী হিসেবেও পরিচিত। এর মধ্যে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে ভিন্ন ভাষাভাষি ১৪টি জাতিগোষ্ঠী, যারা সম্মিলিতভাবে নিজেদেরকে জুম্ম বলে অভিহিত করে থাকে। ব্রিটিশরা আসার পূর্বে সেই সামন্তবাদী যুগে এইসব জাতিসমূহের কেউ কেউ স্বাধীন জাতীয় সত্তা ও স্বশাসন নিয়েই স্ব স্ব ভূখন্ডে বসবাস বা রাজত্ব করেছেন। তাই নিজেদের অঞ্চলে বৈদেশিক মোঘল ও সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের আধিপত্য তারা মাথানিচু করে মেনে নেননি। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের দ্বারা পরিচালিত মোঘল ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং সমতলে সাঁওতাল, গারো ও হাজংদের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কিন্তু ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী শাসন-শোষণ অবসান হলেও এসব জাতিগোষ্ঠীর উপর বঞ্চনা ও নিপীড়ন থেমে থাকেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যখন স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী এইসব জাতিসমূহের জাতীয় অস্তিত্বকে হয় অস্বীকার করতে শুরু করে অথবা এই জাতিগোষ্ঠীর জাতীয় অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়ে বাঙালি জাতিতে রূপান্তরিত করার অদ্ভুত পরিকল্পনা উন্মোচিত হতে থাকে। সংবিধান প্রণয়নকালে শাসকগোষ্ঠী এইসব জাতিগোষ্ঠীকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে (এম এন লারমা) বহিরাগত বাঙালির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে স্থানীয় জুম্মদের সংখ্যালঘু করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করা হয় এবং সর্বোপরি সংবিধানে আদিবাসী ও বাঙালি নির্বিশেষে সকল জাতির মানুষকে বাঙালি বলে অভিহিত করা হয়। সেই ভুল এখনো বিদ্যমান রয়েছে, শুধু তাই নয়, সেটা আরও গভীরতর হয়েছে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং আদিবাসীদের উপর অগ্রহণযোগ্য পরিচয় চাপিয়ে দিয়ে।

বর্তমানে বাংলাদেশে জাতি সমস্যা একটি সংকটজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে। বিশেষত বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির শাসকগোষ্ঠী ও কায়েমি স্বার্থবাদীদের নিপীড়ন, শোষণ ও বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জাতিগোষ্ঠীসমূহ জাতিগতভাবে অস্তিত্ব সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখন্ডতা, সংবিধান, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশ ইত্যাদি নানা দোহাই দিয়ে শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের ন্যায্য ও ন্যুনতম জাতীয় বা জাতিসত্তার অধিকারও মেনে নিতে তারা অস্বীকার করছে। এব্যাপারে স্বশাসন তথা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে বা তকমা দেওয়া হচ্ছে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘সন্ত্রাসী’ বলে। বিদ্রোহ দমনের নামে ইতোমধ্যে এক ডজনের অধিক গণহত্যা সংঘটিত করা হয়েছে। শত শত বাড়ি-গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার পরিবারের ভূমি বেদখল করা হয়েছে। কয়েক লক্ষ মানুষকে অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু করা হয়েছে। সরকারিভাবে লক্ষ লক্ষ বহিরাগত বাঙালি অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বসতিপ্রদানের ফলে জুম্মরা আজ নিজ ভূখন্ডেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। সম্পূর্ণ ঔপনিবেশিক কায়দায় বছরের পর বছর ধরে সেনাশাসন ও নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্মদের জন্য এখন কার্যত কারাগারে ও বৃহৎ সেনানিবাসে পর্যবসিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, শাসক মহলের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক ভূমি বেদখল, আক্রমণ, নিপীড়ন ও বৈরী আচরণের কারণে একইভাবে সমতলের আদিবাসীরাও ক্রমাগত প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর হয়ে বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

৩. সমস্যার উৎপত্তি

বস্তুত স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের মধ্যে বিরাজমান ভুল চিন্তাধারা থেকেই বাংলাদেশে জাতি সমস্যার উৎপত্তি। মুক্তিযুদ্ধেরও আগে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাদের বাংলাদেশে জাতি সমস্যার মীমাংসা বিষয়ে অপর জাতিগুলিকে অস্বীকার, অস্বীকৃতি ও অবজ্ঞার ভুল চিন্তাধারা প্রকাশ পায়। তারা নিজের জাতির ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন, উৎসাহী ও উচ্চাকাঙক্ষী, কিন্তু দেশের অস্তিত্বশীল অপর জাতিগুলোর বিষয়ে ছিলেন উদাসীন, অজ্ঞ ও অনাগ্রহী। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক জোর করে উর্দুভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সৃষ্ট বাঙালি মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধর অসাম্প্রদায়িক বাংলা ভাষার আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়বাদের জাগরণ হলেও সেই জাতীয়তাবাদ আওয়ামীলীগেরই নেতৃত্বে ধীরে ধীরে উগ্র জাতীয়তাবাদে, এমনকি উগ্র মুসলমান বাঙালি জাতীয়তাবাদে রূপ লাভ করে। যা পরবর্তীতে বাংলাদেশে মহীরূহ আকার ধারণ করেছে।

লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন’ বই থেকে জানা যায়, ১৯৬২ সালে রাজা ত্রিদিব রায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলে আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান রাজা ত্রিদিব রায়কে ঢাকায় ডেকে পাঠিয়ে কথা বলেন। উদ্দেশ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতারা যেন আওয়ামীলীগের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন। তাঁদের কথোপকথনে দেখা যায়, ত্রিদিব রায় কাপ্তাই বাঁধের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থা তুলে ধরে তাদের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষা এবং পার্বত্য এলাকার জন্য সংবিধানে আলাদা মর্যাদার আকাক্সক্ষা শেখ মুজিবর রহমানের নিকট তুলে ধরেন। কিন্তু শেখ মুজিবর রহমান তাঁর উত্তরে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সাংবিধানিক সুরক্ষা ও আলাদা মর্যাদার কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল উন্নয়ন আর তার দলের প্রার্থীদের সমর্থনের কথা বলেন। এছাড়া স্বাধীনতার আগে শেখ মুজিবর রহমান পূর্ব বাংলার অন্য সকল এলাকা সফর করলেও কখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা সফর করেননি এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাঙালিদের শোষিত হওয়ার কথা তুলে ধরলেও পাহাড়ি মানুষদের শোষিত হওয়ার কথা তুলে ধরেননি বলে জানা যায়।

ড. আমেনা মোহসিন এর ‘পলিটিক্স অব ন্যাশনালিজম..’ বই থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার ঘোষণার পূর্বে বাঙালি জাতিসত্তা এবং পূর্ব বাংলায় বসবাসকারী অ-বাঙালিদের (অর্থাৎ যারা বাঙালি নয়) ভবিষ্যত বিষয়ে শেখ মুজিবর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, “আমি আবারও দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করছি যে, বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই একজন বাঙালি।” পরে ২৬ মার্চ ১৯৭১ গ্রেপ্তারের পূর্বে শেখ মুজিবর রহমান তার স্বাধীনতার ঘোষণায় ‘বাংলাদেশের জনগণ..’ উল্লেখ করলেও সেদিন আওয়ামীলীগের চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান সেই স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তা পাঠ করার সময় ‘বাংলাদেশের জনগণ’ এর স্থানে ‘বাঙালি’ উল্লেখ করে ঘোষণাটি পাঠ করেন।

বস্তুত উপরোক্ত তথ্য থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব কর্তৃক বাঙালি ভিন্ন অন্য সংখ্যালঘু জাতিগুলোর প্রতি একদিকে অস্বীকার, অস্বীকৃতি ও উপেক্ষার মনোভাব প্রকাশ পায়, অপরদিকে সেইসব জাতিগুলোর স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে বিলোপ করে দিয়ে মুসলিম বাঙালি জাতীয়তায় অন্তর্ভুক্তকরণ বা বিলীন করে দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে নিশ্চয়ই অনেক সাধারণ বাঙালির মনেও জুম্ম সহ ভিন্ন জাতির মানুষদের প্রতি একধরনের আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী, নেতিবাচক ও অসহিষ্ণু মনোভাব গড়ে উঠতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই মনোভাবের বহু প্রমাণ পাওয়া যায়, যাতে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের উপর বিমাতাসূলভ ও হিংসাত্মক আচরণ লক্ষ্য করা যায়।

লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এর লেখা থেকে জানা যায়, রাঙামাটির তৎকালীন জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমামের (যিনি পরে শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হন) নেতৃত্বে ২৭ মার্চ রাঙামাটিতে বাঙালি ও জুম্ম ছাত্র-যুবকদের নিয়ে একটি রাইফেল ট্রেনিং আয়োজন করা হয়। তখন বাঙালি ছাত্রের সংখ্যা ছিল কম, কিন্তু বেশির ভাগই জুম্ম ছাত্র-যুবক। কিন্তু ট্রেনিং এর সময় যে স্বল্প সংখ্যক আসল রাইফেল ছিল, সেগুলো সবগুলিই বেছে বেছে বাঙালিদের দেওয়া হয়, জুম্ম ছাত্রদের দেওয়া হয় ডামি রাইফেলগুলো। এতে বাঙালি ও জুম্ম ছাত্রদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করা হয়, জুম্ম ছাত্রদেরকে অবিশ্বাসের উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়।

আরো জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর একটি দল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে প্রবেশ করলে এলাকার একদল চাকমা মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের অভ্যর্ত্থনা জানান। চাকমারা মুক্তিযোদ্ধা দলটিকে একটি খাসিও উপহার দেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা খাসিটি গ্রহণ করে অভ্যর্ত্থনাকারী চাকমা সবাইকে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, মুক্তিযোদ্ধারা আশেপাশের গ্রামে যাকে পায় তাকে হত্যা করে, নারীদের ধর্ষণ করে এবং বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। নারী-পুরুষ-শিশু সহ এতে ৩২ জন জুম্ম নিহত হয়। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিবাহিনী কর্তৃক বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর অঞ্চলে এ ধরনের একাধিক গণহত্যার কথা জানা যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন করেন (কারও কারও মতে বাধ্য হয়ে) এবং কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রাজাকার, শান্তি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন, তবে তাদের দ্বারা সাধারণ জনগণের উপর হামলা বা যুদ্ধের কথা জানা যায় না। বরং বিপরীতে মং রাজা ও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ অধিকাংশ জুম্মই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন।

৪. বাঙালিত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে এম এন লারমার প্রতিবাদ

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২/৩ মাসের মধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে জুম্ম জাতিগোষ্ঠীর বিশিষ্টজনদের উদ্যোগে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ মুজিবর রহমানের সাথে দেখা করতে যান এবং সরকারের নিকট জুম্মদের বক্তব্য ও দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি নিয়ে যান। দেখা যায়, প্রতিবারই প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান জুম্মদের প্রতিনিধিদলকে খুব কম সময় দিয়েছেন এবং প্রতিনিধিদলের সাথে আন্তরিকতা ও আগ্রহভরে মতবিনিময় করেননি। ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। এই প্রতিনিধিদলের তৎকালীন এক তরুণ সদস্য বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মংসানু চৌধুরীর বয়ানে জানা যায়, ‘প্রধানমন্ত্রী খুব ব্যস্ত ছিলেন। আমরা একটা স্মারকলিপি নিয়ে গিয়েছিলাম। এ নিয়ে তেমন কোনো কথা হয়নি। কথা হয়েছে বড়জোর এক থেকে দেড় মিনিট। তিনি আমাদের বললেন, বাংলাদেশ আছে চার মূলনীতির উপর। এদেশে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। ..তিনি উঠে চলে গেলেন (মহিউদ্দিন আহমদ)।’ পরে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে মং রাজা মং প্রু সাইন ও গণপরিষদ সদস্য এম এন লারমার নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল স্মারকলিপি নিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে যান। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ে ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রীর দেখা না পাওয়ায় প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তার নিকট স্মারকলিপিটি রেখে আসেন। সেই স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রী পাঠ করেছেন কিনা তা জানা যায় না।

এরপর ১৯৭২ সালের ২৪ এপ্রিল গণপরিষদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির আহ্বায়ক এম এন লারমার নেতৃত্বে ১২ জনের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবারও স্মারকলিপি দিতে যান। এই স্মারকলিপিতেও পূর্বে প্রদত্ত স্মারকলিপিতে উল্লিখিত চারটি বিষয় আবারও উত্থাপন করা হয়। উক্ত চারটি বিষয় হল-

১. পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং ইহার একটি নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।

২. উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ‘১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি’র ন্যায় অনুরূপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে।

৩. উপজাতীয় রাজাদের দপ্তর সংরক্ষণ করা হবে।

৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয় নিয়ে কোন শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয়, এরূপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে।

স্মারকলিপিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ স্মারকলিপিখানি মনেপ্রাণে সমর্থন করেন, উক্ত চারটি বিষয় তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবি এবং এই চারটি বিষয় পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জাতীয় অস্তিত্বের চাবিকাঠি বলে উল্লেখ করা হয়। মহিউদ্দিন আহমদের লেখা থেকে জানা যায়, “স্মারকলিপিটি মানবেন্দ্র লারমার হাতেই ছিল। প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, এতে কী লেখা আছে। লারমা এটি পড়ে শোনান। প্রধানমন্ত্রী স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেননি। …প্রধানমন্ত্রী তাঁদের দাবিগুলো সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন, আমরা সবাই বাঙালি। তোমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ভুলে যাও, বাঙালি হয়ে যাও। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের ধমক দিয়ে বলেন যে, যদি তারা তাদের দাবিতে অনড় থাকে, তাহলে তিনি বাঙালি ঢুকিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভাসিয়ে দেবেন।’ শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, যে পাকিস্তান সরকার কাপ্তাই বাঁধ করে জুম্মদের ডুবিয়ে দিয়ে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছিল, যে পাকিস্তানের শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে যার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয় সেই নেতাই পাকিস্তানীদের ন্যায় বলছেন বাঙালি ঢুকিয়ে দিয়ে জুম্মদের ভাসিয়ে দেবেন। অর্থাৎ পাকিস্তানীরা কাপ্তাই বাঁধের জলে ডুবিয়েছিল, এবার বাঙালি ঢুকিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। কী নির্মম পরিহাস!

১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলে ৩৩ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন সহ কমিটির সবাই আওয়ামীলীগের সদস্য। ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গণপরিষদে খসড়া সংবিধানটি বিল আকারে উত্থাপন করে। ১৯ অক্টোবর ১৯৭২ প্রথমবার এবং ২৫ অক্টোবর ১৯৭২ দ্বিতীয়বার এম এন লারমা গণপরিষদের বিতর্কে সংবিধান বিলের উপর দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ আলোচনা করেন। এতে তিনি সংবিধানটি জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রচারের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন এবং সংবিধানের উপর সামগ্রিক আলোচনা করেন। এসময় এম এন লারমা সংবিধানে কৃষক-শ্রমিক-নারী সহ মেহনতি মানুষ, বাংলাদেশের যারা সত্যিকারের শোষিত, নিপীড়িত তাদের কথা, তাদের মনের কথা স্থান পায়নি বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া তিনি তথ্য ও যুক্তি দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার অস্তিত্বের কথা, তাদের ইতিহাসের কথা, তাদের অধিকারের কথা খসড়া সংবিধানে নাই বলে তাঁর আলোচনায় উল্লেখ করেন। উক্ত আলোচনার সময় বেশ কিছু গণপরিষদ সদস্য এম এন লারমাকে বার বার বাধা দিয়ে আলোচনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন এবং এম এন লারমার বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক হলেও তা তারা অগ্রাহ্য করেন এবং অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান নিয়ে সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক ঘটনাটি ঘটে ১৯৭২ সালে ৩১ অক্টোবর, সেদিন ৬ অনুচ্ছেদ এর নাগরিকত্বের উপর সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদে ছিল, ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।’ গণপরিষদ সদস্য ও আওয়ামীলীগের এক নেতা জনাব আঃ রাজ্জাক ভূঁইয়া প্রস্তাব করেন যে, সংবিধান বিলের উক্ত ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে ‘৬। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’ সংবিধানের উক্ত সংশোধনী প্রস্তাব দ্বারা সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হল যে, হয় বাংলাদেশে আদিবাসী ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই, নয়তো পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশে বসবাসকারী আদিবাসীরা আদৌ বাংলাদেশের নাগরিক পদবাচ্য নয়। বস্তুত উক্ত সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে, আনুষ্ঠানিকভাবে জুম্ম সহ আদিবাসীদের স্বতন্ত্র জাতীয় অস্তিত্বকে, তাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অন্যায়ভাবে বাঙালি জাতিত্বকে চাপিয়ে দেওয়া হয়।

উক্ত সংশোধনী প্রস্তাবের জবাবে এম এন লারমা বলেন, ‘..কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ- কেউ বলে নাই, আমি বাঙালি।’ স্পীকার প্রশ্ন করে বলেন, আপনি কি বাঙালি হতে চান না? তার জবাবে এম এন লারমা আরো বলেন, ‘আমাদিগকে বাঙালি জাতি বলে কখনো বলা হয় নাই। আমরা কোনোদিনই নিজেদের বাঙালি বলে মনে করি নাই। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাশ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদের বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।’ কিন্তু এম এন লারমার এই অকাট্য যুক্তি সত্ত্বেও সরকার পক্ষ কোনো প্রকার উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও যুক্তি উপস্থাপন না করেই উক্ত ৬নং অনুচ্ছেদের সংশোধনী সংসদে গৃহীত হয়। এম এন লারমা এর প্রতিবাদ জানান এবং প্রতিবাদ স্বরূপ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য গণপরিষদের বৈঠক বর্জন করে পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান।

কিন্তু কী অদ্ভুত ও দুঃখজনক ব্যাপার হল, এম এন লারমা কক্ষ ত্যাগ করার পরও শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম এম এন লারমার পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করার বিষয়ে বেশ কিছুক্ষণ বক্তব্য রাখেন এবং তিনিও সবাইকে বাঙালি জাতির পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষেই সাফাই গাইলেন। তিনি আরও বললেন, ‘বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে রাজী না হয়ে বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেন। আমরা শুধু পরিষদ সদস্যবৃন্দই নই- আমি মনে করি, সারা বাঙালি জাতি এতে মর্মাহত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ৫ লক্ষ উপজাতি রয়েছে, তাঁরা বাঙালি। তাঁরা সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অঙ্গ..।’ আজকে আমার অবাক লাগে, তারা নতুন স্বাধীন দেশ ও বাঙালি জাতির কর্ণধার, অথচ দৃষ্টিভঙ্গি কী একপেশে, অন্ধ ও অযৌক্তিক! যারা অযৌক্তিকভাবে জাতীয়তা চাপিয়ে দিচ্ছেন তারাই মর্মাহত বলে উল্লেখ করছেন, অপরদিকে জুম্মদের যাদের জাতীয় পরিচয়, অস্তিত্ব ও অধিকারকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং ধ্বংস করা হচ্ছে তাদের জন্য তাঁরা মোটেও মর্মাহত নয়।

আরও উদ্বেগজনক ব্যাপার হল, ১৯৭৩ সালে এম এন লারমার নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করলেন, বৈঠকে বসলেন এবং আবারও জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা ও অধিকারের দাবি জানালেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধিদলটির সদস্যদের হতবাক ও স্তম্ভিত করে দিয়ে বললেন, ‘লারমা তুমি কী মনে কর। তোমরা আছ ৫/৬ লাখ, বাড়াবাড়ি করো না। চুপচাপ করে থাক। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোমাদেরকে অস্ত্র দিয়ে মারবো না, (হাতের তুড়ি মেরে মেরে তিনি বলতে লাগলেন) প্রয়োজনে ১, ২, ৩, ৪, ৫…১০ লাখ বাঙালি অনুপ্রবেশ করে তোমাদের উৎখাত করবো, ধ্বংস করবো।’

ড. আমেনা মোহসিন পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতিসমূহের প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবের আমলের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে সারসংকলন করেন অনেকটা এইভাবে- জাতীয়তাবাদের বাঙালি মডেলটি ছিল একটি আধিপত্যবাদী মডেল। ইহা মূলত একটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী মডেল যা ব্যতিক্রমহীনভাবে অ-বাঙালি সম্প্রদায়কে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণ সুস্পষ্টভাবে এই মডেলকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদের এই ব্র্যান্ডকে ইসলামীকরণ করার জন্য প্রচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু তাতেও পাহাড়ি জনগেণর জন্য কোনো স্থান ছিল না।

তাহলে ভেবে দেখুন, জুম্মরা কেন আত্মরক্ষা করবে না? কেন জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করবে না? কেন জনসংহতি সমিতি, শান্তিবাহিনী গঠন করবে না? কেন কঠোর আন্দোলন তথা সশস্ত্র সংগ্রামের পথে যেতে বাধ্য হবে না?

৫. জাতিগত আগ্রাসন ও ঔপনিবেশিকতা

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জনসংহতি সমিতিরই নেতৃত্বে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চল হতে এম এন লারমা এবং দক্ষিণাঞ্চল হতে চাথোয়াই রোয়াজা চৌধুরী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলেন। আর সারাদেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামীলীগ আবার সরকার গঠন করলো। এম এন লারমা আবারও সংসদে সামগ্রিকভাবে দেশের স্বার্থে দেশের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে গেলেন। শেখ মুজিবর রহমান একসময় দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটিমাত্র বৈধ দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ (বাকশাল) ঘোষণা করলেন, যা নানা মহলের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। শেখ মুজিবের আহ্বানে এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বার্থে এম এন লারমা বাকশালে যোগ দিতে রাজী হলেন। কিন্তু যে শেখ মুজিবর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদে অতি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, সেই তিনিই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট উচ্চাভিলাষী ও ষড়যন্ত্রকারী একদল বাঙালি সেনা কর্মকর্তা কর্তৃক সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হলেন। সাথে সাথে সেবারের মত আওয়ামীলীগের তথা বাকশালের শাসনও শেষ হয়ে যায়। এরপর কার্যত সেনাবাহিনীর হাতেই দেশের ভাগ্য চলে যায়। ততক্ষণে সভাপতি এম এন লারমা এবং সাধারণ সম্পাদক ও ফিল্ড কমান্ডার জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, শান্তিবাহিনী, ছাত্র সমিতি জঙ্গলে আত্মগোপনে চলে যায় এবং সশস্ত্র সংগ্রামই তাদের আন্দোলনের প্রধান রূপ হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে সেনাবাহিনীতে একের পর এক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাপ্রধান হয়ে উপপ্রধান সামরকি আইন প্রশাসক হন এবং ১৯৭৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের ক্ষমতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারপ্রধান হন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর প্রথমদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক দিককে উপেক্ষা করলেন, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো অর্থনৈতিক বলে চিহ্নিত করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করলেন। পাহাড়ি বিশিষ্ট ও অভিজাত ব্যক্তিদের দিয়ে ট্রাইবেল কনভেনশন গঠন করলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উন্নয়ন বোর্ড দেখিয়ে বিদেশি দাতাগোষ্ঠী থেকে অর্থ সংগ্রহ করা এবং সেই টাকা দিয়ে এলাকায় কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করা, বিশেষত সেনাবাহিনীর জন্য রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ঘটানো। নানাভাবে জুম্মদের আন্দোলনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা। এ প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘বিভিন্ন প্রকল্পের ধরন দেখে মনে হয়, উন্নয়ন বোর্ডের কাজ হচ্ছে শান্তিবাহিনীকে ঠেকানো। উপজাতীয় নেতাদের বাগে আনার জন্য তাদের অনেককেই ব্যক্তিগত ঋণ দেওয়া হয়। এছাড়া রাস্তা তৈরি, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিদ্যুতায়ন ইত্যাদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এসব প্রকল্পের সামরিক গুরুত্ব অনেক। পরে চট্টগ্রামের এরিয়া কমান্ডার ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসিকে পদাধিকারবলে উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল।’ অপরদিকে, তিন রাজাদের নেতৃত্বে ও সমাজের বিভিন্ন বিশিষ্ট জনদের নিয়ে ট্রাইবেল কনভেনশন গঠন করে তা দিয়ে জনসংহতি সমিতির বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার, জুম্মদের বিভক্ত করার, জনসংহতি সমিতিকে সামাজিক ও সাংগঠনিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ব্যর্থ চেষ্টা করা হল। পাশাপাশি তা দিয়ে জনসংহতি সমিতির সাথে আলোচনারও একটা প্রক্রিয়া রাখা হয়।

এক পর্যায়ে জিয়াউর রহমান নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করলেন এবং তিনি আওয়ামীলীগের থেকে ভিন্নভাবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এর কথা বললেন। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ শুনতে তুলনামূলকভাবে উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও চমকপ্রদ হলেও কিন্তু অচিরেই কার্যত তাও যে বর্জনমূলক ও উগ্র ইসলামী জাতীয়তাবাদী এবং এই জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারীদের যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও জুম্মদের প্রতি আরও আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী ও জুম্মবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তা অচিরেই উন্মোচিত হতে থাকে। এরই মধ্যে ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি (খাগড়াছড়ির দীঘিনালা এবং বান্দরবানের আলকিদম ও রুমায়) সেনানিবাস স্থাপন করা হয়। একদিকে উন্নয়নের কথা, অপরদিকে জুম্মদের রাজনৈতিক দাবিকে উপেক্ষা করে চলতে থাকে সামরিকায়ন এবং জুম্মদের সামরিকভাবে দমনের প্রস্তুতি। এর মধ্যে জনসংহতি সমিতি বার্তা দিয়ে আলোচনার আগ্রহ দেখালেও জিয়াউর রহমান কালক্ষেপণ করেন। ১৯৭৯ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে সরকার গঠন করার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার সবচেয়ে অন্যায়, অমানবিক ও আগ্রাসী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন। বস্তুত শেখ মুজিবর রহমান যে বাঙালি অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে জুম্মদের ভাসিয়ে দেওয়ার কথা মুখে বলেছিলেন, সেটাই জিয়াউর রহমান অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন। এই বছরই তিনি বাংলাদেশের সমতল এলাকার বিভিন্ন জেলা থেকে ছিন্নমূল, দরিদ্র ও আগ্রহী বাঙালি পরিবার সংগ্রহ করে সরকারি উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতিদানের নীলনকশা বাস্তবায়ন শুরু করেন। এসময় রাঙামাটির একমাত্র জুরাছড়ি উপজেলা বাদে বাকী নয়টি উপজেলায় এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি, মাটিরাঙ্গাসহ বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক পরিমাণে বহিরাগত বাঙালির অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়। ১৯৭৯ হতে ১৯৮৪/৮৫ এর মধ্যে জিয়াউর রহমান ও সামরিক শাসক এরশাদের আমলের প্রথমদিকে অন্তত ৪-৫ লক্ষ বহিরাগত বাঙালি অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়, যাদেরকে সেটেলার বাঙালি বলে অভিহিত করা হয়। এসময় শান্তিবাহিনী দমনের নামে সাধারণ জুম্মদের উপর দমন-পীড়ন চালানো হয় এবং গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আর জুম্মদের জায়গা বেদখল করে সেখানে সেটেলার বাঙালিদের বসতি দেওয়া হয় এবং ভূয়া দলিল করে তাদেরকে ব্যাপক জমি-ভূমি দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এসময় সেনাবাহিনী ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় পরস্পরের উপর হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়।

এমনই এক পরিস্থিতিতে ১৯৮০ সালের ২৫ মার্চ রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলা সদরের জুম্ম অধ্যুষিত এলাকায় সেনাবাহিনী ও সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক জুম্মদের উপর বর্বরোচিত গণহত্যা সংঘটিত করা হয়, ইতিহাসে যা কাউখালী গণহত্যা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সেনা কর্তৃপক্ষ সেদিন ঠান্ডামাথায় মিটিং-এর কথা বলে জুম্মদের স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারে ডেকে আনে এবং সেনা সদস্য ও সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে শত শত জুম্ম নারী-পুরুষকে হত্যা করা হয় এবং সাথে সাথে আশেপাশের জুম্ম গ্রামে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে অন্তত ৩০০ জন জুম্মকে মেরে ফেলা হয় বলে উল্লেখ করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য উপেন্দ্র লাল চাকমা। শুধু তাই নয়, এরপরও জিয়াউর রহমান, এরশাদের নয় বছরের শাসনামল এবং তৎপরবর্তী খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি আমল (১৯৯৩ সাল) পর্যন্ত সেনাবাহিনী-বিডিআর ও সেটেলার বাঙালি কর্তৃক ছোট-বড় অন্তত ১৮টি গণহত্যা সংঘটিত করা হয়। এরই পাশাপাশি গোপনেও চলতে থাকে বহিরাগত বাঙালির অনুপ্রবেশ। ফলে সেটেলার বাঙালিদের বসতি ও ভূমি বেদখল আরও সম্প্রসারিত হয়।

এই অবস্থায় শত শত একর ভূমি, জমি ও গ্রাম এখনো অন্যায় ও অবৈধভাবে সেটেলার বাঙালিদের দখলে রয়েছে। ফলস্বরূপ হাজার হাজার জুম্ম পরিবার অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হয়ে বসবাস করছে, যারা এখনো পর্যন্ত নিজেদের ভূমি ফিরে পায়নি, নিজের গ্রামে ফিরে যেতে পারেনি। অনেক ইউনিয়ন, উপজেলায়, পৌরসভায় নিজভূমিতে জুম্মরাই সংখ্যালঘু হয়ে বসবাস করছে। সেখানে প্রতিনিয়ত সেটেলার বাঙালিরা আরও ভূমি বেদখলের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই সেটেলার বাঙালিদের দ্বারা এপর্যন্ত বহু জুম্ম নারী-শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও খুনের শিকার হয়ে আসছে। বান্দরবানে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মত গণহত্যা সংঘটিত না হলেও সেখানে সেনা নিপীড়ন, নীরবে বহিরাগত অনুপ্রবেশ, নানা কায়দায় জুম্মদের ভূমি বেদখল থেমে থাকেনি। বর্তমানে বান্দরবানে জুম্মদের ভূমির বিরাট একটি অংশ সেনাবাহিনী, প্রভাবশালী বহিরাগত বাঙালি ও অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারা বেদখল হয়ে রয়েছে। এছাড়া, সেখানে বিভিন্ন অঞ্চলে জুম্মদের দারিদ্র্যতা ও শিক্ষার অভাবের সুযোগে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় মৌলবাদীদের কর্তৃক শিশুসহ অনেক জুম্মকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এধরনের কয়েকটি গ্রামও রয়েছে। পার্বত্য এলাকার বহু স্থানীয় নাম বিকৃত করে বাঙালিকরণ করা হচ্ছে। সরকার ও প্রশাসন কর্তৃক অমুসলিম জুম্মদের সম্বোধনে জনাব, জনাবা, বেগম, মোহাম্মদ ইত্যাদি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশ বিভাগের সময় (১৯৪৭ সালে) পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মরা যেখানে ৯৮% ভাগ ছিলেন, বর্তমানে বহিরাগত অনুপ্রবেশ ও নিপীড়নের ফলে অনেক জুম্ম দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ায়, জুম্মরাই এখন সংখ্যালঘু হয়েছে বলে সাম্প্রতিক আদমশুমারিতে উঠে এসেছে।

বস্তুত স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সরকার বা শাসকদলই জুম্মদের জাতিগত অস্তিত্ব, জাতীয় পরিচয়, জাতিগত অধিকার, তাদের ভূমি ও ভূখন্ডের অধিকার, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে আন্তরিকভাবে সম্মান জানাতে ও স্বীকৃতি দিতে পারেননি। তারা সবসময়ই জাত্যভিমান ও ক্ষমতার অবস্থানে থেকে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানীদেরই কায়দায় ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্যায়ভাবে জুম্মদের নিয়ন্ত্রণ, দমন-পীড়ন, শোষণ, আগ্রাসন, আধিপত্য চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। যা কখনোই বিশ্ব মানবতা, মানবাধিকারের মূলনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

৬. পার্বত্য চুক্তি নিয়ে ষড়যন্ত্র

সশস্ত্র সংগ্রাম, দেশে-বিদেশে নানা তৎপরতার পাশাপাশি জনসংহতি সমিতি শুরু থেকে বরাবরই সরকারের সাথে আলোচনার প্রক্রিয়া খোলা রাখে। এজন্য এরশাদ আমল, স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি আমল এবং এরপর শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ আমল পর্যন্ত সরকার দলের প্রতিনিধি ও জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধিদলের মধ্যে ২৬টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)।

কিন্তু বিগত প্রায় ২৭ বছরেও চুক্তিটি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি এবং এ পর্যন্ত চুক্তির কোনো মৌলিক ধারাই বাস্তবায়ন করা হয়নি। চুক্তির আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিশেষ শাসন ব্যবস্থার জন্য আঞ্চলিক পরিষদ গঠন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ভূমি কমিশন এবং শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের জন্য টাস্কফোর্স, চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সেগুলো কখনো চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখেনি বা রাখতে পারেনি। এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরকারী দল আওয়ামীলীগ সর্বশেষ একনাগাড়ে প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত সমস্যার যে মূল সমস্যাগুলো রয়েছে, যেমন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি তথা জুম্মদের বেদখলকৃত ভূমি ফেরতদান, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের স্ব স্ব ভূমিতে পুনর্বাসন, সেনাশাসন সহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদকে কার্যকর করে বিশেষ শাসন ব্যবস্থা জোরদার, স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা ও পরিষদসমূহের নির্বাচন, অবৈধভাবে বসতিস্থাপনকারী সেটেলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, তৎকালে সেটেলার বাঙালিদের নিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং পাহাড়িদের মধ্যে ইউপিডিএফের নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী উপযুক্ত যুক্তি ছাড়াই তাদের কায়েমি স্বার্থে চুক্তির বিরোধীতা করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসী পাহাড়ি-বাঙালি সিংহভাগ মানুষই অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং অনেক আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে পার্বত্য চুক্তির প্রতি সমর্থন জানায়, মেনে নেয়। দেশের অধিকাংশ মানুষ এবং জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক মহলও চুক্তির প্রতি ব্যাপক সমর্থন জানায়। তবে, চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ শুরু থেকে চুক্তি বিরোধীতা ও পুর্ণস্বায়ত্তশাসনের নামে সশস্ত্র হতে শুরু করে এবং জনসংহতি সমিতির বিভিন্ন স্তরের সদস্য ও চুক্তির সমর্থক জনগণকে নাজেহাল, অপমান থেকে শুরু করে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মারধর, এমনকি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হত্যা করা শুরু করে করে। এসময় জনসংহতি সমিতি ও এর সহযোগী সংগঠনসমূহ বারবার নিয়মতান্ত্রিকভাবে মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন করে, স্মারকলিপি দিয়ে সরকার ও প্রশাসনের নিকট উক্ত সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধের ব্যবস্থা এবং জনসংহতি সমিতির সদস্য ও জনগণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার আহ্বান ও দাবি জানায়। কিন্তু সরকার ও প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। একসময় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা নানিয়ারচর এলাকা থেকে তিন বিদেশি নাগরিককেও অপহরণ করে। পরে সরকারি দলের স্থানীয় নেতৃত্ব ও সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় কয়েক কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে সেই বিদেশিদের মুক্ত করা হয়। এসময় অভিযোগ ওঠে, সরকারি দলের স্থানীয় নেতৃত্ব ও সেনাবাহিনীর একটি মহলের ষড়যন্ত্র ও কায়েমি উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই তারা অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদেরকে মুক্তিপণ প্রদানের ব্যবস্থা করে। এভাবে চুক্তির ফলে সৃষ্ট শান্তিপূর্ণ পরিবশে আবারও অশান্তির ছায়া নেমে আসে।

এহেন প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সরকারি দলের কায়েমি স্বার্থবাদী স্থানীয় নেতৃত্ব, সরকারি দল ও এর বাইরে থাকা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, সর্বোপরি সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যেকার উগ্র জাতীয়তাবাদী, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও জুম্মবিদ্বেষী গোষ্ঠী সবাই তাদের স্ব স্ব সংকীর্ণ উদ্দেশ্য ও কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী ষড়যন্ত্রের মঞ্চে একে একে আবির্ভূত হতে থাকে। ফলে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি সরকার ও সরকারের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের নানা টালবাহানা ও ষড়যন্ত্রের কারণে চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী নানা পদক্ষেপ গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে থাকে। অপরদিকে, চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফের সশস্ত্র তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর থেকে দ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকায়ন, সেনা তৎপরতা এবং চুক্তির পূর্বের ন্যায় সেনা সর্বক্ষেত্রে সেনা কর্তৃত্ব, জুম্মদের গ্রামে গ্রামে সেনা অভিযান, বাড়ি তল্লাসি, আটক, মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার, মারধর ইত্যাদি জোরদার করা হয়। এরপর সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চুক্তি বিরোধী মহলটি চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফকে নানাভাবে ব্যবহার করতে থাকে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ জনসংহতি সমিতি, এর সহযোগী সংগঠন ও জনগণকে দমন ও ধ্বংস করতে সৃষ্টি করে আরও নানা সশস্ত্র গোষ্ঠী। সর্বশেষ তারা সৃষ্টি করে চুক্তি ও জনসংহতি সমিতি বিরোধী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। বর্তমানে সেনাবাহিনীরই মদদে রাজস্থলীতে তৎপর রয়েছে মগ পার্টি। বলাবাহুল্য, বর্তমানেও কার্যত সেনাশাসনই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন ও জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।

৭. এম এন লারমার চিন্তাধারা এবং সমাধানের প্রশ্ন

১৯৪৮ সালের বিশ্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা’র অনুচ্ছেদ-১ এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সকল মানুষ স্বাধীনভাবে এবং সমমর্যাদা ও সমান অধিকার নিয়ে জন্মায়। তাদের উচিত বিচারবুদ্ধি ও বিবেকের অধিকার এবং ভ্রাতৃত্বের মনোভাব নিয়ে পরস্পরের সাথে আচরণ করা।’ অনুচ্ছেদঃ ১৫ এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘১. প্রত্যেকেরই একটি জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে। ২. কাউকেই যথেচ্ছভাবে তার জাতীয়তা থেকে বঞ্চিত করা অথবা তাকে তার জাতীয়তা পবিবর্তনের অধিকার অস্বীকার করা যাবে না।’ এছাড়া ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চুক্তি, উভয় চুক্তিতেই অনুচ্ছেদঃ ১ এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘১. সকল মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। এই অধিকারবলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং তাদের আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশে স্বাধীনভাবে প্রয়াসী হয়।’ আইএলও কনভেনশন ১০৭, এতেও আদিবাসী ও ট্রাইবেল জনগোষ্ঠীর স্বশাসন, ভূমি ও ভূখন্ডের অধিকার, স্বকীয় ঐতিহ্য রক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের সকল মানুষ, জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য উপরোক্ত মানবাধিকারসমূহ প্রযোজ্য এবং অপরিহার্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত মহান নেতা এবং তৎকালীন গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জন্য যে স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেন, পরে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি যে আঞ্চলিক স্বাত্তশাসনের দাবি তোলেন এবং সর্বশেষ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মধ্য দিয়ে যে বিশেষ শাসন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে তার কোনোটাই উপরোক্ত মানবাধিকারসমূহের পরিপন্থী নয়। বরং উক্ত মানবাধিকারসমূহের পরিপূরক ন্যূনতম দাবি। কিন্তু সেই ন্যূনতম দাবির স্বীকৃতি দিতে ও বাস্তবায়ন করতেও সরকার ও শাসকগোষ্ঠী উৎসাহী নয়। বরং তারা বারবার ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে জুম্মদের জাতীয়তা লাভের অধিকারকে কেড়ে নিয়েছে এবং বঞ্চিত করেছে। যা কোনোভাবেই প্রগতিশীল নয়, প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা বলে বিবেচনা করা যায়। বহ আগে (১৮৪৭ সালের নভেম্বরে) এঙ্গেলস বলেছিলেন, যে জাতি অপর জাতির উপর নিপীড়ন চালায় সেই জাতি নিজেও নিপীড়ন মুক্ত হতে পারে না। বাঙালি জাতি ও সমাজের মধ্যে বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় তারা যেমন বারবার সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছেন, তেমনি জুম্মসহ ভিন্ন জাতির জনগণকেও তারা অপরিসীম বঞ্চনা ও নিপীড়ন করে চলেছেন।

গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদের আলোচনায় এম এন লারমা বারবার বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, ধর্মনিরপেক্ষ, শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পেতে চেয়েছেন। নিজের জাতিসত্তার অধিকার বিসর্জন দিয়ে তিনি বাঙালি হতে চাননি সত্য, কিন্তু বাঙালি সমাজের মধ্যে যেন শোষণ-বঞ্চনা ও বৈষম্য না থাকে, বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, নারী, মেহনতি গরীব মানুষ যাতে তার ন্যায্য অধিকার পায়, তার জন্য তিনি সংবিধান রচনার সময় এবং সংসদে ব্যাপক আলোচনা করেন, দাবি উত্থাপন করেন।

বৈষম্যহীন বাঙালি জাতির পাশপাশি জুম্ম জাতিও যাতে স্বীকৃতি পায় এবং বাঙালিদের পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে এবং দেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারে সেকথাই সবসময় বলেছেন এম এন লারমা। বাঙালি জাতির দ্বারা জুম্ম জাতিসমূহ যাতে বৈষম্য ও আগ্রাসনের শিকার না হয় তার নিশ্চয়তা চেয়েছেন তিনি। কিন্তু উগ্রজাতীয়তাবাদী বাঙালি শাসকগোষ্ঠী গোড়া থেকে জুম্মদের জাতিগত স্বীকৃতি ও অধিকার দিতে অনীহ হওয়ায় এম এন লারমার বক্তব্যকে রাষ্ট্রবিরোধী, সংবিধানবিরোধী ও বাঙালি বিরোধী বলে অপপ্রচার করার প্রয়াস পান।

এম এন লারমা বাঙালি জাতিকে যেমনি স্বীকার ও সম্মান করতেন, তেমনি তাঁদের কাছ থেকে তিনি নিজেও নিজের জাতির স্বীকৃতি ও সম্মান লাভের আশা করেছিলেন। প্রত্যেক জাতিকে ও জাতির মানুষকে সম্মান করা এবং সমমর্যাদা ও সমঅধিকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পারা এম এন লারমার একটি সহজাত গুণ এবং তাঁর আদর্শগত শিক্ষা। তাইতো তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের যুগ যুগ ধরে শোষণ-বঞ্চনার শিকার ভিন্ন ভিন্ন ১৪টি জাতিগোষ্ঠীকে জুম্ম জাতীয়তাবাদের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন। সরকার চেয়েছিল মুসলিম বাঙালি ভিন্ন অন্য জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে এসকল ভিন্ন জাতির মানুষকে মুসলিম জাতির মধ্যে আত্তীকরণের মাধ্যমে জাতিসমস্যার সমাধান করতে। এম এন লারমা চেয়েছিলেন সকল জাতির অস্তিত্ব ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিগত সমস্যার সমাধান করতে। শাসকগোষ্ঠীর নীতি ও পদক্ষেপ বাংলাদেশের জাতিসমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

জাতিসমস্যা সমাধানের মূল উপাদান অধিকারকামী জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। এই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার হতে পারে নানা মাত্রায়। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, সার্বভৌম কাঠামোর মধ্যে আলাদা রাজ্যের স্বীকৃতি (ভারতে যেভাবে মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মনিপুর ইত্যাদি) ইত্যাদি। জুম্মরা শুরুতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও জুম্মল্যান্ড নামে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করলেও পরে, পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের স্বীকৃতি সহ বিশেষ শাসন ব্যবস্থার স্বীকৃতি আদায় করে। এটিও একপ্রকার স্বায়ত্তশাসন এবং সীমিত মাত্রার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। পার্বত্য চুক্তি জুম্মদের বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এবং জুম্মদের ন্যূনতম জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার চাবিকাঠি। পার্বত্য চট্টগ্রামে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য এবং স্বকীয় জাতিসত্তা নিয়ে বিকশিত হওয়ার জন্য চুক্তিতে স্বীকৃত অধিকারসমূহ জুম্মদের জন্য অপরিহার্য। এইসব অধিকার নিশ্চিত না হওয়ার অর্থই হল, জুম্মদের জাতিগতভাবে বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হওয়া। অধিকার সচেতন, অধিকারকামী ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কোনো মানুষ ও জাতিই অন্যায় শাসন-শোষণ, দমন-পীড়ন ও আধিপত্য মেনে নিতে পারে না। জোরজবরদস্তি করে কোনো সত্যকে মিথ্যা করা যায় না। অন্যায়ভাবে বল প্রয়োগ করে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে কোনোভাবেই জাতিসমস্যার সমাধান করা যায় না। কারোর ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত ইচ্ছানুযায়ী যেমন কোনো জাতি গড়ে উঠে না, তেমনি কোনো জাতিকেও গ্রাস করা যায় না। বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় বাহিনী যা করছে তা কোনোভাবে ন্যায়সঙ্গত নয়, দেশের জন্য, দেশের জাতীয় সংহতির জন্য মঙ্গলজনক ও মর্যাদারকর নয়। কাজেই পার্বত্য চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সহ বঞ্চিত সকলের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই পার্বত্য সমস্যার যথাযথ সমাধান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে।

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে ঢাকায় ‘বিপ্লবী এম এন লারমা’র ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন জাতীয় কমিটি’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্মরণ-সংকলন ২০২৪’ প্রকাশনায়। এখানে ইষৎ সংক্ষিপ্ত করে পূণঃপ্রকাশ করা হল।]