হিল ভয়েস, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ঢাকা: আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, ঢাকায় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে “জাত্যভিমানী সংবিধানের খেরোখাতায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন” শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
উক্ত আলোচনা সভায় ‘বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি ২০২৬’ এর সদস্য সচিব মনিরা ত্রিপুরার সঞ্চালনায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক, গবেষক ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট ড. মারুফ মল্লিক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী ড. ঈশিতা দস্তিদার এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা প্রমূখ।
আলোচনায় সভা প্রধান হিসেবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি’র আহ্বায়ক লেখক, গবেষক পাভেল পার্থ। তিনি তার উপস্থাপনায় বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন বাংলাদেশের সংবিধানের আলাম (চাকমাদের বুনন শিল্প) এবং বাঙালি ব্যতীত অন্যান্য জাতিসমূহের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে রাষ্ট্র বাঙালি কর্তৃত্ববাদের জাত্যভিমানী চরিত্রকেই জাহির করছে।
তিনি বলেন, এম এন লারমার সংবিধান দর্শনে জুম চাষ, কৃষি চাষ, রাজস্ব আদায়, উদপাদন ব্যবস্থায় কৃষি প্রশ্ন, পরিবেশ-প্রতিবেশ দর্শন তথা শোষিত-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীসমূহের অধিকারকে সন্নিবেশিত করাসহ নারী প্রশ্ন বৈজ্ঞানিক বহুত্ববাদী রাষ্ট্রেরই ধারকবাহক। যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, পাকিস্তান শাসনামলে কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ এবং তার সম্ভাব্য ফলাফল; বিশাল জনপদ, চাষযোগ্য ভূমি, শস্য ও প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস হওয়ার যে আগাম বার্তা, তার উদ্ভব, তিনি যে পরিবেশ বা সমাজে বেড়ে উঠেছিলেন তা থেকে বিকশিত।
আদিবাসী স্বীকৃতির প্রশ্নে তিনি বলেন, আদিবাসী শব্দটি জাতিসংঘের চাপিয়ে দেওয়া এমন ন্যারেটিভ অনেকেই প্রতিষ্ঠা করতে চায় যা বস্তুত বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশের ভূখন্ডে আদিবাসীদের অস্তিত্বের উদাহরণ আরও বহু প্রাচীন। বাংলাদেশ সংসদ ভবন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মনিপুরী আদিবাসীদের ভূমিতে, মনিপুরী পাড়ায়, দেশের প্রথম এয়ারপোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলও আদিবাসীদের ভূমিতে, কুর্মিতোলায়। কুর্মি বাংলাদেশের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছিল। এছাড়াও, তিনি ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত উচায় আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পাহাড়পুর আদিবাসী বিদ্যালয়ের উদাহরণ তুলে ধরেন যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আদিবাসী এবং বাঙালিরাই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আদিবাসী-বাঙালির ঐতিহাসিক সম্প্রীতি অস্বীকার করে উপজাতি-ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নানা পরিচয়ের হীন বাইনারি ন্যারেটিভের মাধ্যমে রাষ্ট্র কলোনিয়াল শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে বদ্ধপরিকর।
ঈশিতা দস্তিদার বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জীবন এবং অধিকার সম্পর্কিত অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর সঙ্গে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন জড়িত যা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। এ যুগে পরিবেশ বিপর্যয়ে জনপদগুলো যখন বিপর্যস্ত হচ্ছে তখন লারমার পরিবেশ-প্রতিবেশ দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা উঠে আসে। শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, লারমার রাজনৈতিক জীবনে দস্তিদার পরিবার খুবই কাছ থেকেই সম্পৃক্ত। ৬০ এর দশকে যখন পাহাড়ি ছাত্র সমিতি’র প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তার অনতিদূরেই ছিল দস্তিদার বাড়ি।
দীপায়ন খীসা বলেন, বিএনপি এবং তারেক রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ স্পষ্ট নয় বরং ধোঁয়াশাজনক, তার চাইতে লারমার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শন অধিক স্পষ্ট এবং বৈজ্ঞানিক। ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলে হয়েছে এম এন লারমা তা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদে বলেছিলেন। তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি বা রেইনবো নেশন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে সামরিক বাহিনী, ডিজিএফআই এবং এনএসআই’য়ের সমন্বয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিপীড়ক কমিটি গঠন করছে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির ফলে সৃষ্ট পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী বসিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নতুন নিরাপত্তার চশমায় দেখছে বিএনপি সরকার যা সংকটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিবে।
মেইনথিন প্রমীলা বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র যতভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করুক আদিবাসীরা আদিবাসীই। নানা ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যমে আদিবাসীদের রাষ্ট্রীয় অধিকারকে ঢামাচাপা দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তন হওয়ার পরও সরকারের দখলদার চরিত্র পরিবর্তিত হয় না। এম এন লারমার সংবিধান দর্শনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য হলেও এম এন লারমার সংবিধান দর্শন পর্যালোচনা করা উচিত।
ফিরোজ আহমেদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণীর সামরিক এবং আমলাতন্ত্রিক ব্যক্তিবর্গের বাণিজ্যিক কুঠি। যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করছে এবং মুনাফা অর্জন করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর নব্য স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকীকরণের এবং সেটেলার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছিল, তা সত্বেও প্রতিহিংসা পেরিয়ে সংবিধান দর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালন করা এম এন লারমার দ্বারাই সম্ভব ছিল। গণপরিষদ বিতর্ক হতে বুঝা যায়, লারমা কার্যত বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনে সোচ্চার ছিলেন।
ড. আমেনা মহসিন বলেন, সরকারের কাছে পাহাড়িদের যে অস্থির সংকট তৈরি হচ্ছে সেটি ৭২ সালের সংবিধানের সময়ও ছিলো। সেসময় এম এন লারমার যে ভূমিকা সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভিন্ন জাতির হয়ে একাই নিজেদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন। সর্বোপরি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা তুলে এনে তিনি সংবিধানের ত্রুটিগুলো বিশ্লেষণ করেছিলেন। বর্তমান বিএনপির যে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ তার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জায়গায় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মধ্যে দিয়ে কতটুকু অন্তর্ভুক্তি সম্ভব সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে কতটুকু গণতন্ত্র চর্চা হচ্ছে সেসব বিষয়ও তুলে আনা প্রয়োজন।
মারুফ মল্লিক বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সংবিধানে চাপিয়ে দেওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ কখনো গ্রহণযোগ্য নয়, এটি রাষ্ট্রে বহুত্ববাদী অন্তর্ভুক্তির পথে অন্তরায়। ৭২ সালের সংবিধানের প্রণয়নকালে এম এন লারমার দর্শন বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রের কাছে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। ২৪ এর অভ্যুত্থানের পরে নতুন একটা সুযোগ এসেছে পুরনো ভুলগুলো ঠিক করার। বিএনপি সরকার যদি জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে এবং রেইনবো নেশন প্রক্রিয়ার মধ্যে সকলকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে নতুন কিছু আশা করা যায়, তার ব্যতীত নয়।