Tuesday, 22 Sep 2026
আন্তর্জাতিক August 17, 2026

আদিবাসী পরিচয় অস্বীকার করে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার ও আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী দাবি সিএইচটি কমিশন ও ইবগিয়ার

হিল ভয়েস, ১৭ আগস্ট ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদক: বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় অস্বীকার করে সরকারের দুই মন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী এবং স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে দুটি আন্তর্জাতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটি কমিশন) ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (ইবগিয়া)।

গত ১১ আগস্ট ২০২৬, ঢাকায় অনুষ্ঠিত “ইনডিজেনাস আইডেন্টিটি ইজ ইরিলিভেন্ট ফর বাংলাদেশ” শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় সরকারের দুই মন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।

উক্ত গোলটেবিল আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, সকলের একমাত্র পরিচয় বাংলাদেশি। একইসঙ্গে জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র (ইউএনডিআরআইপি) ও আইএলও কনভেনশন ১৬৯ বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয় বলে মন্তব্য করেন।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘আদিবাসী’ শব্দটি কেবল আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং বাংলাদেশে এটি অপ্রাসঙ্গিক।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মন্তব্য করেন যে, আদিবাসী পরিচয় স্বীকার করলে সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে এবং দেশের ১০ ভাগের এক ভাগ ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে।

সিএইচটি কমিশন ও ইবগিয়া এর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আদিবাসী পরিচয় ও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়। বাংলাদেশের আদিবাসীরা একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নাগরিক এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আদিবাসী পরিচয় কোনো হুমকি নয়, বরং এটি একটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুস্বাক্ষর না করলেও আইএলও কনভেনশন ১০৭, শিশু অধিকার সনদ, সিডও (CEDAW), আইসিসিপিআর এবং আইসিইএসসিআর-এ অনুস্বাক্ষরকারী দেশ। ফলে এই হিসেবে আদিবাসীদের পরিচয়, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদ এবং অর্থ আইন (১৯৯৫), আয়কর আইন (২০২৩), জাতীয় শিক্ষানীতি (২০১০)-সহ একাধিক রাষ্ট্রীয় নীতিতে আদিবাসী বা পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি রয়েছে। তাছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও একাধিকবার তাদের “আদিবাসী” হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন এবং ২০০৩ সালে আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাণীও দিয়েছেন।

যৌথ বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয় যে, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পার্বত্য অঞ্চলকে ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আদিবাসী পরিচয় অস্বীকার অব্যাহত থাকলে পার্বত্য চুক্তির চেতনা ও শান্তিপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থা দুর্বল হবে।

সংগঠন দুটি দুই মন্ত্রীর বিতর্কিত বক্তব্য দ্রুত প্রত্যাহার বা স্পষ্টীকরণ করা; চাপিয়ে দেওয়া অপমানজনক শব্দের বদলে আত্ম-পরিচয়ের অধিকারকে সম্মান জানানো; গণমাধ্যম বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে বাধা না দেওয়া; শান্তিপূর্ণ আদিবাসীদের আন্দোলনকে রাষ্ট্রবিরোধী, ষড়যন্ত্রমূলক বা জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি এইসব বক্তব্য বন্ধ করা; পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতল আদিবাসী জনগণের প্রতিনিধি সংস্থা, সংগঠন, নারী, যুবক এবং অধিকার কর্মীদের সাথে সংলাপ শুরু করা; আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইএলও ১০৭ ও ১৬৯) এবং ইউএনডিআরআইপি-র নীতিমালা অনুসরণ করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের মাধ্যমে ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি এবং সামরিক শাসন প্রত্যাহার সহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য একটি স্পষ্ট ও সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ গ্রহণ করার দাবি জানিয়েছে।

বিবৃতির শেষে বলা হয়, আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশ বিভক্ত হবে না; বরং তাদের পরিচয় অস্বীকার, বৈষম্য ও দমন বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।