Tuesday, 22 Sep 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম September 15, 2026

বান্দরবানে মহান নেতা এম এন লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী

হিল ভয়েস, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বান্দরবান: আজ (১৫ সেপ্টেম্বর) বান্দরবান জেলা সদরে মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভা ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি এবং আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব উশৈহ্লা মারমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক উ উইন মং জলি। অন্যান্যদের মধ্যে আরও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি সুমন মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সিংমেউ মারমা প্রমুখ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

স্বাগত বক্তব্যে রাখেন, আয়োজক কমিটির সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, বান্দরবান জেলা কমিটির ছাত্র ও যুব বিষয়ক সহসম্পাদক থোয়াইক্যজাই চাক। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে পুরো বাংলাদেশ রাষ্ট্র যখন স্বাধীন হয় মহান নেতা এম এন লারমা তৎকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের সকল নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত, গরীব কৃষক, খেটে খাওয়া সকল সাধারণ মানুষের কথা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মহান সংসদে তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন। পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত ও শোষিত জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের বান্দরবান জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রোংথইং ম্রো বলেন, আজকে এম এন লারমাকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সবার আগে যে প্রশ্ন উঠে আসবে সেটি হচ্ছে তাঁর আদর্শ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংসদ অধিবেশনে কাঁপানো তার সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য। তিনি একাই কীভাবে আমাদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতিগোষ্ঠীর অধিকার গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি সকলকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তা কর্ণপাত করেনি। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ছাত্র ও যুব সমাজকে মহান নেতা এম এন লারমার আদর্শকে ধারণ করে অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই সংগ্রামে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সিংমেউ মারমা বলেন, মহান নেতা এম এন লারমাকে স্মরণ করা মানেই হলো তার আদর্শকে সম্মান জানানো। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ বর্তমান আধুনিক যুগে এসেও কতটুকু পিছিয়ে পড়া সেটা বর্তমান ছাত্র-যুব সমাজ ও নারী সমাজকে উপলব্ধি করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা কেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত সেইসব প্রশ্ন আমাদের মনে জাগ্রত করতে হবে। পাহাড়ের বর্তমান নারী সমাজ যাতে রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার হয় এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন তিনি সেই দাবি ও আহ্বান জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি সুমন মারমা বলেন, গত ১২ই সেপ্টেম্বর মহান নেতা এম এন লারমার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কবিতা আবৃত্তি ও বিষয়ভিত্তিক বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অনেক ছাত্র-ছাত্রী অংশগ্রহণ করেছিলেন৷ আজকে ১৫ সেপ্টেম্বর তারই ধারাবাহিকতায় এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীরা এখনো ভালো বক্তা হয়ে উঠতে পারেনি, কারণ তারা বই পড়ে না জ্ঞান চর্চা করে না। বর্তমান তরুণ ও ছাত্র সমাজ বাংলাদেশকে নিয়ে অধ্যয়ন করেন না, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস-সংস্কৃতি নিয়ে অধ্যয়ন করে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে তাদের ধারণা নেই, কারণ তারা অধ্যয়ন করে না। এম এন লারমার আদর্শ ও জীবনী নিয়ে অধ্যয়ন করে না।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই মহান নেতা এম এন লারমার প্রসঙ্গ উঠে আসে।

তিনি বলেন, এম এন লারমাকে অধ্যয়ন করা মানেই কাপ্তাই বাঁধের ইতিহাস সম্পর্কে জানা৷ বাঁধের ফলে কিভাবে হাজার হাজার একর জমি পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভূমিহারা, বাস্তুহারা হয়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলো। এই কারণে এই বক্তৃতা প্রতিযোগিতা প্রাসঙ্গিক। কারণ এম এন লারমা শুধুমাত্র একজন সাংসদ, জাতীয় নেতা এবং আইনজীবী ছিলেন না, তিনি একজন সুবক্তাও ছিলেন। সুমন মারমা বলেন, আমাদের সমাজে সুবক্তা ও অনুপ্রেরণাদানকারী দরকার, কিন্তু শিক্ষার্থী বন্ধুরা অধ্যয়ন না করায় সেটা হয়ে উঠছে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস জানার পাশাপাশি এম এন লারমাকে জানতে হবে।

প্রধান আলোচক উ উইন মং জলি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশে অসংখ্য রাজনৈতিক, সাহিত্যক ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের কাছে এম এন লারমা প্রাসঙ্গিক। এম এন লারমা কিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতির অগ্রদূত হলেন? কিভাবে তিনি আমাদের অবিসংবাধিত নেতায় পরিনত হলেন সেইসব ইতিহাস জানতে হলে এম এন লারমার জীবনী নিয়ে অধ্যয়ন করতে হবে। তিনি ভারত, পাকিস্তান ভাগের দ্বিজাতিতত্ত্ব ও বৃটিশদের ‘ভাগ করো শাসন করো’ পলিসি থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৬০ দশকের কাপ্তাই বাঁধের ইতিহাস এবং এম এন লারমার আত্মজীবনী নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপস্থিত সকলের সামনে তুলে ধরে তার আলোচনা শেষ করেন।

সবশেষে মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কবিতা আবৃত্তি ও বিষয়ভিত্তিক বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। সভার সভাপতি মেঞোচিং মারমা বলেন, যারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন পুরস্কার পাওয়া বড় বিষয় নয়, বরং অংশগ্রহণের মাঝে মাহাত্ম্য রয়েছে। প্রতিযোগী সকলের সফলতা কামনা করে অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেন সভার সভাপতি মেঞোচিং মারমা।