হিল ভয়েস, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ঢাকা: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে সম্প্রতি দুই মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যকে সাংঘর্ষিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের ৪৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক। বিবৃতিতে তাঁরা ওই দুই মন্ত্রীর মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছেন।
গত ১১ আগস্ট ২০২৬, ঢাকায় ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই, সকল নাগরিককে কেবল বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত এবং জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র (ইউএনডিআরআইপি) ও আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেনি, তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তথ্যমন্ত্রীও একইভাবে দাবি করেছেন যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “আদিবাসী” শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক। মন্ত্রীদের এ বক্তব্যের পরিপ্রক্ষিতে আজ মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ২০২৬ এই যৌথ বিবৃতি প্রদান করা হয়।
নাগরিক সমাজের পক্ষে যৌথ বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠান অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, মন্ত্রীদের এ ধরনের বক্তব্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকারকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। তাঁরা স্পষ্ট করেন যে, আদিবাসী পরিচয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়। সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠীর স্বকীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে মন্ত্রীদের বক্তব্য সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণা (UNDRIP) বা ILO কনভেনশন ১৬৯ অনুসমর্থন না করলেও, ১৯৫৭ সালের ILO কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে যা আইনত বাধ্যতামূলক। ফলে আদিবাসীদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া ১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্টের ৯৭ ধারা, অর্থ আইন ১৯৯৫, আয়কর আইন ২০২৩ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-সহ নানা রাষ্ট্রীয় আইনে ‘আদিবাসী’ শব্দটির স্পষ্ট উল্লেখ ও অধিকার সুরক্ষার বিধান রয়েছে।
বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলা হয়, নির্বাচিত বিএনপি সরকার দেশকে ‘রেইনবো নেশন’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। যদি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই অস্বীকার করা হয়, তবে কীভাবে ‘রেইনবো নেশন’ গঠন সম্ভব?
নাগরিকরা আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বাণীতে আদিবাসীদের সমান মর্যাদার নাগরিক এবং তাঁদের ঐতিহ্যকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ‘বাংলাদেশে আদিবাসী নেই’—এই তত্ত্ব মূলত বিগত পতিত স্বৈরশাসকদের উদ্ভাবন। বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের মুখে ওই একই তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শেষে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ ধরণের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়া হলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আশংকা সৃষ্টি করতে পারে বলেও জানান।
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন তারা হলেন:-
১. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
২. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি
৩. শিরীন পারভিন হক, সদস্য, নারীপক্ষ
৪. আবু সাঈদ খান, লেখক ও সাংবাদিক
৫. রাশেদা কে চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
৬. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি
৭. শাহিন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
৮. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সভাপতি, আইন ও সালিস কেন্দ্র
৯. ডা: মং উষা থোরাই, সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
১০. ড. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী
১১. ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অনরারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট ও সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১২. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
১৩. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৪. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোট
১৫. রেহেনুমা আহমেদ, লেখক ও গবেষক
১৬. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৭. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৮. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯. তাসনিম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২০. ড. মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
২১. ড. ফিরদৌস আজীম, অধ্যাপক, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়
২২. ড. ফস্টিনা পেরেইরা, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
২৩. ড. মোশরেকা অদিতি হক, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
২৪. অ্যাডভোকেট সালমা আলী, নির্বাহী পরিচালক, বি এন ডব্লিউ এল এ
২৫. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
২৬. সায়দিয়া গুলরুখ, সাংবাদিক ও গবেষক
২৭. রোজিনা বেগম, গবেষক ও অধিকার কর্মী
২৮. বিলু কবীর, কবি ও গবেষক
২৯. মনিন্দ্র কুমার নাথ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ
৩০. সালেহ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন
৩১. পারভেজ হাসেম, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
৩২. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ
৩৩. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী
৩৪. শাহেদ কায়েস, কবি ও প্রাবন্ধিক
৩৫. মিঠুন রাকসান, আদিবাসী কবি ও সংস্কৃতি কর্মী
৩৬. হাফিজ রশিদ খান, কবি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কর্মী
৩৭. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার কর্মী
৩৮. জাহেদ হাসান, মানবাধিকার কর্মী
৩৯. আমিনুর রসুল, পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মী
৪০. জুয়েল মারাক, সাংবাদিক ও অধিকার কর্মী
৪১. ইন্টু মনি তালুকদার, প্রকাশক ও আদিবাসী সংস্কৃতি কর্মী
৪২. ড. হানা শামস আহমেদ, অধিকার কর্মী
৪৩. ড. নাসরিন খন্দকার, নৃবিজ্ঞানী
৪৪. হিরণ মিত্র চাকমা, আদিবাসী ও মানবাধিকার কর্মী