হিল ভয়েস, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাঙামাটি: পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) কাপ্তাই থানা শাখার উদ্যোগে জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার (এম এন লারমা) ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে উক্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পিসিপি কাপ্তাই থানা শাখার সভাপতি কেতন তঞ্চঙ্গ্যার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক অনন্তজীবন তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুনীতি বিকাশ চাকমা, রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সজল চাকমা এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন কর্ণফুলী সরকারি কলেজ শাখার সদস্য প্রশান্ত তালুকদার।
এছাড়াও আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন পিসিপি কাপ্তাই থানা ও কর্ণফুলী সরকারি কলেজ শাখার নেতৃবৃন্দ।
কেন্দ্রীয় সদস্য সুনীতি বিকাশ চাকমা বলেন, এম এন লারমা ছাত্রজীবন থেকেই দূরদর্শী ও সংগ্রামী ছিলেন। কাপ্তাই বাঁধের ফলে জুম্ম জনগণের ৫৪ হাজার একর জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়া এবং হাজার হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে তিনি ছাত্র অবস্থাতেই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এজন্য তাকে দুই বছর কারাবরণও করতে হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, যতদিন মহান নেতা এম এন লারমার আদর্শ ধারণ করতে পারবোনা ততক্ষণ আমরা আমাদের মুক্তি আমাদের অধিকারের প্রয়োজনীয়তার তারনা বুঝতে পারবোনা। তিনি একাধারে শিক্ষক, আইনজীবী ও সংসদ সদস্য হয়েও ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে শোষিত জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। পার্বত্য অঞ্চলের ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তি স্থাপন করেন। জুম্ম জনগণকে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রতিবাদে তিনি ঐতিহাসিক সংসদ বর্জনের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাই এম এন লারমার আদর্শ তার জীবন ও দর্শন প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
সজল চাকমা বলেন, এম এন লারমা জীবন ও সংগ্ৰাম নিয়ে ক্ষণিকের আলোচনায় ব্যাখা করা সম্ভব নয়। তার জীবন ও দর্শন প্রতিটি সময়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে জুম্ম সমাজের মাঝে চেতনায় নিমজ্জিত রাখা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ ব্যবস্থা ঘুণেধরা ও পশ্চাৎপদ সমাজ ব্যবস্থা ছিলো। এই ঘুমন্ত সমাজ ব্যবস্থার মাঝে এম এন লারমা শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, লড়াই সংগ্রামে উজ্জীবিত করেছিলেন। জুম্ম জনগণ একসময় স্বাধীন ছিলো। স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছিলো। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকারগুলো একে একে বিলীন করা হয়েছে। এই অঞ্চলের জন্য যেসব আইন বিধান নিহিত ছিলো সেটি বাতিল বা অকার্যকর করে রাখা হয়েছিলো। তখন সেভাবে জুম্ম জনগণের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনার অভাব ছিলো, জুম্ম জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলার নেতৃত্বের অভাব ছিলো। সে অভাব জুম্ম সমাজের মাঝে প্রথম ফুটে তুলেছিলেন এম এন লারমা।
তিনি বলেন, জাতির সামনে দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অধিকার আদায় করতে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা তিনি জুম্ম সমাজের মাঝে জাগিয়েছিলেন। তারই তারনায় ১৯৭২ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারী জুম্ম জনগণের একমাত্র কান্ডারী রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গঠন করে। যে সংগঠনের হাত ধরে দীর্ঘ দুই দশক ধরে শাসকগোষ্ঠীর জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র লড়াই হয়েছে। সে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার বাধ্য হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে উপনীত হতে। কিন্তু দীর্ঘ বছর পার হলেও সে চুক্তি এখনো বাস্তবায়নে কোন অগ্ৰগতি জুম্ম জনগণ দেখতে পায়নি। শাসকগোষ্ঠী চুক্তি বাস্তবায়ন না করে উল্টো চুক্তিকে লঙ্ঘন করে নানা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রমূলক কাজ পার্বত্য চট্টগ্রামে জিইয়ে রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, বক্তারা এম এন লারমার বিপ্লবী চেতনা ও জীবনদর্শন শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি পাহাড়ের ইতিহাস ও জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ে ছাত্রসমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং আন্দোলনমুখী হওয়ার আহ্বান জানান।