হিল ভয়েস, ৩০ আগস্ট ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদক: সরকার প্রথমদিকে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করলেও একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম বহির্ভূত চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চুক্তিকে পদদলিত করে। এর কিছু দিনের মধ্যে দীপেন দেওয়ান মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন, যা প্রতিমন্ত্রী হেলাল উদ্দিনের ষড়যন্ত্রে সংঘটিত হয় বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
অপরদিকে, অতি সম্প্রতি জেলা/জেলাসমূহের আইন-শৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সার্বিক সরকারি কার্যাবলী তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব বন্টনের ক্ষেত্রেও পার্বত্য চুক্তি ও এর মূল চেতনাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ উপরোক্ত বিষয়ে সদ্য নিযুক্ত পার্বত্য মন্ত্রী সাচিংপ্রু জেরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কক্সবাজার জেলা, অপরদিকে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয় বিতর্কিত প্রতিমন্ত্রী হেলালকে, যা জনমনে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ঘ খন্ডের ১৯নং ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘উপজাতীয়দের (জুম্ম) মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ শুধু তাই নয়, এই মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করার জন্য (১) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী, (২) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ, (৩) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, (৪) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ, (৫) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ, (৬) সাংসদ, রাঙ্গামাটি, (৭) সাংসদ, খাগড়াছড়ি, (৮) সাংসদ, বান্দরবান, (৯) চাকমা রাজা, (১০) বোমাং রাজা, (১১) মং রাজা এবং (১২) তিন পার্বত্য জেলা হতে সরকার কর্তৃক মনোনীত এলাকার স্থায়ী অধিবাসী তিন জন অউপজাতীয় (বাঙালি) সদস্য-কে নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করার বিধান রয়েছে। অথচ সরকার চুক্তির উক্ত ধারাকে পদদলিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী নয় এমন একজন বাঙালিকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। অপরদিকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি গঠনে সরকারে কোনো উদ্যোগ ও আলোচনা দেখা যায় না।
এছাড়া পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ কমিটি, যেমন পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরীবীক্ষণ কমিটি, জুম্ম শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠনেও সরকারের কোনো উদ্যোগ ও আলোচনার কথা জানা যায় না।
এমতাবস্থায় সরকার কর্তৃক কক্সবাজার জেলার আইন-শৃঙ্খলা, দুর্নীতি, উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়সহ সার্বিক সরকারি কার্যাবলী তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পার্বত্য মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরীকে প্রদান এবং তিন পার্বত্য জেলার দায়িত্ব প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালকে প্রদান পার্বত্য সমস্যাকে অবহেলা এবং পার্বত্য চুক্তিকে উপেক্ষা ও পদদলিত করার সামিল বলে বিবেচনা করা যায়।
উল্লেখ্য যে, পার্বত্য সমস্যা দীর্ঘদিনের একটি জটিল ও জাতীয় সমস্যা হিসেবে সর্বজনবিদিত। দীর্ঘ সময় ধরে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের এক পর্যায়ে এই সমস্যা রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের লক্ষে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের সাথে জুম্ম জনগণ সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বা শান্তিচুক্তি নামে বহুল পরিচিত। কিন্তু বিগত ২৯ বছরেও কোনো মৌলিক বিষয়সহ চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য সমস্যা আবারো নাজুক হয়ে উঠেছে। বিগত সরকারগুলোর বিরুদ্ধে চুক্তি নিয়ে ব্যাপক প্রতারণা ও টালবাহানার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে এই অবস্থায় পার্বত্য সমস্যার সমাধান এবং পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পার্বত্যমন্ত্রীর সর্বাধিক মনোযোগ ও গুরুত্ব প্রদান জরুরি বলে অনেকের অভিমত। তাদের অভিমত, পার্বত্যমন্ত্রীর উচিত, কক্সবাজার নয়, পার্বত্য সমস্যা ও চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে জরুরি যোগাযোগ ও আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা। পার্বত্যমন্ত্রী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক সমস্যা সমাধানের কর্তব্যই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।