হিল ভয়েস, ২৬ জুন ২০২৬, ঢাকা: আজ শুক্রবার (২৬ জুন) ‘সকল প্রকার ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে আদিবাসী শ্রমিক এক হও, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে অধিকতর সামিল হউন’ উক্ত স্লোগানকে সামনে রেখে আদিবাসী শ্রমিক ফোরাম ঢাকাস্থ সাভার অঞ্চলের ৩য় সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সম্মেলন ও কাউন্সিলে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় স্টাফ সদস্য হিরন মিত্র চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় স্টাফ সদস্য মেরিন চাকমা, আদিবাসী অধিকার কর্মী ত্রিজিনাদ চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগর সভাপতি কনেজ চাকমা এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশন সদস্য কলি চাকমা প্রমুখ।
রিপন চাকমা (রিঙ্কু) সভাপতিত্বে উক্ত সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আদিবাসী শ্রমিক ফোরামের বিদায়ী কমিটির অর্থ সম্পাদক সন্তোষ চাকমা। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন আদিবাসী শ্রমিক ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক জ্ঞানজ্যোতি চাকমা এবং ঢাকাস্থ সাভারে আদিবাসী সমাজের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন বরুন বিকাশ চাকমা।
এই সময় হিরন মিত্র চাকমা বলেন, সংগঠন হলো লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার। আর সেই সংগঠনের কর্মীবাহিনীদের নিঃসন্দেহে ত্যাগী ভূমিকা পালন করতে হবে। আদিবাসীদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। চব্বিশের গনভ্যুথানের পর আমরা মনে করেছিলাম সংখ্যালঘু আদিবাসীদের জন্য হয়তো সুখবর আসবে। কিন্তু আমরা দেখলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পলিসি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যারা ছিলেন তারাও আদিবাসীদের কথা ভুলে যাই। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তেমন কোনো অগ্রগতি ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি। বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই মৌলবাদী শক্তির উত্থান লক্ষ্যে করা গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ভেবেছিলাম নির্বাচন পরবর্তী যে সরকার শাসনভার গ্রহণ করবে তা নিশ্চয়ই আদিবাসীদের নিয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু সরকার গঠনের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন পাহাড়ি পূর্ণ মন্ত্রীর পাশাপাশি একজন অ-পাহাড়িকে প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। যা পার্বত্য চুক্তির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কিছুদিন আগে অসুস্থতার অজুহাতে সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানকেও পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি দেখলে বুঝা যায় আমরা কোন অবস্থায় আছি। চুক্তি পরবর্তী শাসকগোষ্ঠীর নানা ষড়যন্ত্রের ফলে পার্বত্য চুক্তি বিরোধীর শক্তির উত্থান ঘটেছে। সুতরাং, এখনই ভাববার সময় এসেছে জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শ্রমিক, মেহনতি, ছাত্র-যুবক সম্মিলনে বৃহত্তর আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য ।
ত্রিজিনাদ চাকমা বলেন, মহান পার্টির ঘোষিত বৃহত্তর আন্দোলনে সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত করার পরপরই চুক্তি বিরোধী শক্তি উত্থান হয়ে ষড়যন্ত্রের বিষ বপন করেছিল। সেই শক্তি দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে চুক্তি বিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বাঁধাগ্রস্ত করেই যাচ্ছে। আমি এই আহ্বান রাখতে চাই জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আদিবাসী শ্রমিক ফোরামও সামিল হবে এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
মেরিন চাকমা বলেন, আমরা সেই ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় থেকে ঢাকাস্থ সাভারে আদিবাসী শ্রমজীবী মানুষদের সাথে মহান পার্টির আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। নানা প্রতিবন্ধকতা পেড়িয়ে আজকে আদিবাসী শ্রমিক ফোরাম এ পর্যন্ত এসেছে। মহান পার্টি তথা জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পথচলায় শ্রমজীবী মানুষদের অবদানও কম নয়। একটি জাতির মুক্তির জন্য প্রয়োজন আত্মবলিদান। আমরা যদি অধিকার আদায়ের জন্য আত্মত্যাগ করতে না পারি তাহলে অচিরেই নিজ ভূমি থেকে বিলিন হয়ে যাব।
তিনি আরো বলেন, জুম্ম জনগণের মুক্তির সনদ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে সকলকে সামিল হতে হবে। একদিকে যেমন মহান পার্টির নেতৃত্বে চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন, অন্যদিকে চুক্তি বিরোধী শক্তি নানাভাবে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। সময় এখন সেই শক্তিকে প্রতিহত করার। আমাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে কি ভূমিকা রাখা উচিত তা আজই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
কনেজ চাকমা বলেন, আজকে আমরা যারা শহরে বসবাস করি তারা নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি। সেই জায়গা থেকে একটি সংগঠন কেবল সমগ্র জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। আদিবাসী শ্রমিক ফোরাম সে দায়িত্ব নিয়ে মহান পার্টির আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জুম্ম জনগনের অধিকার আদায়ের আন্দোলন তথা পার্টির যে সংগ্রাম তা শ্রমিক মেহনতি মানুষদেরও জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। পার্বত্য চুক্তি জুম্ম জনগণের একটি ঐতিহাসিক আইনি ভিত্তি। এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একমাত্র আমাদের অধিকার আদায় সম্ভব।
কলি চাকমা বলেন, আমরা যেখানে থাকি না কেন আমাদের শেকড় ও পরিচয় এক ও অভিন্ন। নিজের শেকড় ও ইতিহাস ভুলে কোনো জাতি কখনোই নিজেদের অধিকার আদায় করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীতে যত আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে, সেখানে নারীদের অবদান কোনো অংশেই কম নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা শুধু অংশগ্রহণই করেননি, বরং আন্দোলনকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এই বাস্তবতা আমাদের শেখায় যে, একটি জাতির মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নারী-পুরুষ সবার সমান অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
সম্মেলন শেষে রিপন চাকমা (রিঙ্কু) কে সভাপতি, শুভাশিষ চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক এবং জ্ঞানজ্যোতি চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ২৭ সদস্য বিশিষ্ট আদিবাসী শ্রমিক ফোরাম কমিটি ঘোষণা করা হয়।
উক্ত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক বেবিলন চাকমা।