শুভজিৎ চাকমা
দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের অতি পরিচিত এক নাম। অতি সম্প্রতি তাঁকে নিয়ে আরো অনেক কৌতুহল এবং নানা জিজ্ঞাসা বেড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পেরিয়ে সমগ্র দেশে এমনকি দেশের বাইরেও। তাঁর অন্য অনেক পরিচয়ের মাঝে একটি বড় পরিচয় তিনি একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় তাঁর জন্ম। কর্মজীবনে তিনি একজন যুগ্ম-জেলা জজ ছিলেন। রাজনীতিতে যোগদান করার কারণে অসময়ে চাকরি জীবন থেকে অবসর নেন। ২০০৫ সালে সরাসরি যুক্ত হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গে। তখন থেকে তিনি রাজনীতির পাশাপাশি ওকালতি আদালতে করতে থাকেন।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ঐতিহ্যগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিএনপির রাজনীতি তেমন একটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলনা। বিশেষ করে পাহাড়ি জনগণ বিএনপির রাজনীতিকে একটা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকে। এর অনেক কারণ রয়েছে যা এখানে অল্প পরিসরে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কিন্তু দীপেন দেওয়ানের জনপ্রিয়তার কারণে ধীরে ধীরে সেই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি ঘটে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায়, এমনকি এর প্রভাবে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের দলীয় অবস্থান অনেক শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়।
রাজনীতিতে যোগদান করার সাথে সাথে দীপেন দেওয়ান কেবল নিজ দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তাঁর যোগাযোগ ও কাজের পরিধি সীমিত রাখেননি। তিনি তাঁর অমায়িক ও ভদ্র ব্যবহার আর আচার-আচরন দিয়ে দলমত নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষদের মুগ্ধ করতেন এবং নানা সামাজিক কাজে যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হতেন। তাঁর নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলী সবাইকে মুগ্ধ না করে পারে না! এমনকি তিনি আদালতে ওকালতিও করতেন সাধারণ মানুষের সেবা করার অংশ হিসেবে। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি শুধু নিজ জেলায় নয়, সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের বিএনপির রাজনীতিতে এক ভরসাপূর্ণ নেতৃত্বে পরিণত হন। ফলে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা গড়ে ওঠে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে জয়যুক্ত হন। তার কল্যানে লাভ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার ১০২ দিনের মাথায় শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি হঠাৎ বিগত ০১/০৬/২০২৬ খ্রিঃ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। পাহাড়ি-বাঙালি সবার কাছে তিনি সমান জনপ্রিয় একজন নেতা। তাই তাঁর সেই পদত্যাগ সকলের কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কারো নিকটই তাঁর পদত্যাগের কারণ গ্রহণযোগ্য হয়নি। ফলে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণ থেকে শুরু করে সমাজের নানা শ্রেণি ও পেশাসহ সাধারণ মানুষের নিকট এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে থাকে। তাছাড়া দেশের বাইরেও তাঁর এই পদত্যাগের বিষয়ে নানা কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে এবং বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এনিয়ে বাংলাদেশ সরকার নানামুখী চাপ ও অস্বস্তিতে আছে বলে বিভিন্ন প্রচার ও সংবাদ মাধ্যমে ইতিমধ্যে অনেক অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষনাত্মক রিপোর্টও প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।
খোদ দীপেন দেওয়ানের নিজ রাজনৈতিক দলের ভিতরেও তৃনমুল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং অভিযোগ দেখা দিয়েছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বিএনপির দলীয় নেতা-কর্মীরা দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের খবর পাওয়ার পর পরই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং জেলার নানা জায়গায় প্রতিবাদ মিছিল, সমাবেশ আয়োজন ও রাস্তা ব্লক করে অবরোধ এবং মানববন্ধন করাসহ নানাভাবে ও উপায়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। আর স্বাভাবিকভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের সাধারণ জনতার উদ্যোগেও দীপেন দেওয়ানের প্রতি সমর্থন জানানো হয় এবং তাঁর পদত্যাগ প্রত্যাহার করার দাবিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন আয়োজন করা হয় এবং সেইসব সভা ও মানববন্ধন থেকে দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রীত্ব পদে পুনর্বহাল করার জন্য দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ অনেক আবেগপ্রবন, হতাশ ও ব্যথিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের মাঝে এই পদত্যাগ একটি অশুভ বার্তা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। কারণ এখানকার অধিবাসীরা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহ তাদের স্বশাসন পদ্ধতির ভিত্তিতে কোনদিনই তাদের নিজেদের জীবন ও সমাজ পরিচালনা করার পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদা পায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অন্তর্গত হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক সর্বদা তাদের উপর উপনিবেশিক কায়দায় শাসন-শোষন, বঞ্চনা, দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের সব রকম কায়দা-কৌশল আরোপ করা হয়েছিল। ফলে শোষন-বঞ্চনা ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে প্রান্তিক হতে হতে তাদের জীবন অনেকটা নিঃশেষ হয়ে যাবার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এভাবে চলতে চলতে তাদের জীবনের এক ঐতিহাসিক পর্যায়ে এসে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত হয়।স্বভাবতই চুক্তি নিয়ে তারা নতুনভাবে আশা বাঁধতে শুরু করেছিল। কিন্তু নিয়তি কোনভাবেই তাদের পিছু ছাড়েনি। চুক্তি সম্পাদনের প্রথম দিকে কিছুটা আশার আলো জাগলেও দীর্ঘ ৩০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর্যায়ে এসেও সেই চুক্তি পুরো মাত্রায় বাস্তবায়ন হতে পারেনি, করা হয়নি। পাহাড়িদের এমনি বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ২০২৬ সালে বংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার তিনটি আসনেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থীদেরকে পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণ ভোট দিয়ে নিরংকুশ ব্যবধানে নির্বাচিত করে। সরকার গঠন করা হলে দীপেন দেওয়ানকে পূর্ণ মন্ত্রীরূপে দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে পাহাড়ি-বাঙালি শান্তিপ্রিয় মানুষ এবং যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চায় তারা অনেক আত্মবিশ্বাসী ও আনন্দিত হয়ে পড়ে বিশেষ করে পাহাড়ি জনগণ তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে মনেপ্রাণে ধারণ করে এবং বিশ্বাস করে বিধায় আশা করেছিল যে এইবার হয়তো এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল তাদের জীবনে শান্তি ও নিশ্চয়তা আসতে পারে!
মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পরই দীপেন দেওয়ান পূর্ণ শক্তি ও উদ্যম নিয়ে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে চষে বেড়িয়ে জনগণের সাথে মতবিনিময় করে সরকারের নেওয়া ১৮০ দিনের কর্মসূচিকে সফল করে তোলার লক্ষ্যে জনগণের সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হন। তিনি সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির সুফলকে জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে নিরলসভাবে কাজ করতে থাকেন। এরই মাঝে হঠাৎ তাঁর অনাকাঙ্ক্ষিত সেই পদত্যাগ সবার সামনে এসে হাজির হয়ে থাকে এক বুকভরা দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তা, নানা কৌতুহল, প্রশ্ন এবং অজানা অনেক নতুন বাস্তবতা নিয়ে। এখন নানা মহলে নানা মত, বিশ্লেষন, শংকা, হতাশা কাজ করছে বিশেষ করে পাহাড়িরা সরকার কর্তৃক দীর্ঘ দিনের ঝুলিয়ে রাখা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির একটি সুরাহা হয়তো হতেই পারে এই আশায় বুক বেঁধে ছিল. কিন্তু তা হবার আর আশা তারা দেখতে পাচ্ছে না তাই এখন তারা কি করবে এবং অন্যদিকে সরকার তথা ক্ষমতায় আসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল কি ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে আগামী দিনের পরিস্থিতি কোন দিকে নিয়ে যাবে এই সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে সবাই দেখার অপেক্ষায় আছে।
তাই আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়টি ভবিষ্যত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে যথাযথ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং প্রশাসনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে এবং গণতান্ত্রিক যাত্রা পথে কি প্রভাব ফেলতে পারে তা জানতে ও বুঝতে হলে এবং এর ফলে এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর কি প্রভাব পড়েছে বা আরো ভবিষ্যতে পড়তে পারে এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কি করণীয় আছে তা অনুসন্ধান করার প্রয়োজনে এবং দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে রাষ্ট্রে ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে কি যাবেনা এই সব জানার জন্যও জন প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান কি হবে বা হতে পারে তার গভীরে গিয়ে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। যদি সমগ্র প্রেক্ষিতটাকে আরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে বলি তা হলো কেন দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগ করতে হলো কিংবা করানো হলো তা জানার জন্য। এর পরবর্তী ফলাফল কি হতে পারে তার সম্ভাব্য রূপরেখা বের করার জন্য। ফলাফলের ব্যাপ্তি এখানেই থামবে নাকি আরো প্রসার ঘটবে কিংবা বাড়বে এবং বাড়লে কি পরিমাণে ও মাত্রায় বাড়তে কিংবা প্রসার ঘটতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্ন যা ইতিমধ্যে উদয় হয়েছে সেই সমস্ত প্রশ্নের মীমাংসা করার জন্য।
বাংলাদেশকে ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা কি আছে এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং এসবের অবস্থান তথা সামাজিক চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ এবং এর বিকাশ কোন স্তরে, কিংবা কি পর্যায়ে এবং আকারে রয়েছে তা নির্নয় করার জন্য। এমনকি সবচেয়ে যেটা জরুরী সেটা হলো- এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এর প্রভাব কি হতে পারে তা নির্নয় করার এবং সেই অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের পরবর্তী পরিস্থিতি কোন দিকে ধাবিত হতে পারে কিংবা যেতে পারে তার একটি সম্ভাব্য রূপরেখা দেওয়াসহ ভূ-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিভূ দেশগুলো এই পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে যথেষ্ট পরীক্ষ-নিরীক্ষা করার সেরকম বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তাসহ যা বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে বলেও বোদ্ধা মহলের নিকট প্রতীয়মান হচ্ছে বিধায় এসব কিছুর আলোকেই দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা এবং এর মুল কারণ চিহ্নিত করাসহ এর পরবর্তী প্রভাব নির্নয় করার এবং বোঝার জন্য অনুসন্ধানী বিশ্লেষন করা অত্যন্ত জরুরী ও আবশ্যক হয়ে পড়েছে বিধায় নিম্নে সে বিষয়ে আলোকপাত করা গেল-
এর প্রারম্ভে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে জানার ও বোঝার চেষ্টা করা যাক যে বাংলাদেশ কি গণতান্ত্রিক নাকি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র? তা বুঝতে হলে গণতন্ত্র এবং জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সংজ্ঞার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
গণতন্ত্র হলো একটি বৃহত্তর ধারণা, যেখানে জনগণ সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করে, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র হলো গণতন্ত্রের একটি নির্দিষ্ট রূপ যেখানে নাগরিকরা সরাসরি সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করে।
বলা হয়ে থাকে, তাত্ত্বিক এবং সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিপূর্ণরূপে একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র| তাই এ প্রসঙ্গে এখন জানা দরকার তাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী কিভাবে বাংলাদেশ একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র! প্রথমে তাত্ত্বিকভাবে দেখা যাক। তত্ত্ব অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে নাগরিকরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশ না নিয়ে বরং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন এবং সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের পক্ষে আইন প্রণয়ন ও শাসন কার্য পরিচালনা করেন। আরো স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য যে সকল রাষ্ট্র বিজ্ঞানী জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন সেই সমস্ত সংজ্ঞার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞার দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক-
জে এস মিল (J S Mill-John Stuart Mill) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Considerations on Representative Government- এ বলেছেন যে, জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র হলো এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা যেখানে জনগোষ্ঠী বা তাদের সিংহভাগ অংশ তাদের সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রয়োগ করে। প্রতিনিধিরা মূলত আইনসভা বা সংসদে জনগণের হয়ে দায়িত্ব পালন করে।
এ পর্যায়ে উপরোক্ত তত্ত্বের বিশ্লেষনে যাওয়া যাক। যেহেতু বাংলাদেশের নাগরিকগণ একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর সরাসরি ভোট দানের মাধ্যমে তাদের পছন্দমত প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে আইনসভা বা সংসদে প্রেরণ করে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ তাদের নাগরিকদের পক্ষে কিংবা যারা ভোট দেন তাদের পক্ষে দেশের শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করে থাকে কাজেই উপরোক্ত তত্ত্ব অনুসারে বাংলাদেশ অবশ্যই একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র।