হিল ভয়েস, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদক: তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি নামে তিনটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে।
গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের কমিটি বিষয়ক অধিশাখার অতিরিক্ত সচিব (কমিটি ও অর্থনৈতিক) মো: হুমায়ন কবির কর্তৃক বাংলাদেশ গেজেটে এই তিনটি কমিটি গঠনের বিষয়টি প্রকাশ করা হয়।
তিনটি কমিটির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। উক্ত কমিটিতে অর্থ ও পরিকল্পনা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, ভূমি, আইন, বিচার ও সংসদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীবৃন্দ রয়েছেন। কমিটিতে পররাষ্ট্র ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীদ্বয় এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাকে রাখা হয়েছে। কমিটিতে আরো রয়েছেন মন্ত্রী পরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, তিন পার্বত্য জেলার সাংসদবৃন্দ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালকদ্বয়।
জাতীয় কমিটির কার্যপরিধি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং আন্তসংস্থা বাস্তবায়ন তদারকিকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংস্থাসমূহের কার্যপরিধি ও ক্ষেত্র নির্ধারণ; এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সভাপতি করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিতে ভূমি, আইন, বিচার ও সংসদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিববৃন্দ রয়েছেন। এছাড়া এ কমিটিতে রয়েছেন পুলিশের আইজি এবং এনএসআই, ডিজিএফআই. বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি এর মহাপরিচালকবৃন্দ। রয়েছেন ২৪ পতাতিক ডিভিশনের জিওসি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, এসবি, এনএসআই ও এসএসআইবি এর মহাপরিচালক/পরিচালকবৃন্দ।
নির্বাহী কমিটির অন্যতম কাজ হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়ন বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে প্রচলিত আইন, চুক্তির শর্ত ও বিধি-বিধান পর্যালোচনাপূর্বক প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কার এবং নতুন আইন ও বিধি-বিধান প্রণয়নে সুপারিশ প্রদান করা। তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করে নির্বাহী কমিটি কর্তৃক জাতীয় কমিটির নিকট উপস্থাপন করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত কমিটিতে উপজাতীয় শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানবৃন্দকে সদস্য হিসেবে রাখা রয়েছে।
পরামর্শক কমিটির কার্যপরিধি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন, নিরাপত্তা বিধান, সন্ত্রাস দমন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য আগামী দুই মাসের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটির নিকট সুপারিশ উপস্থাপন করা।
এই তিনটি কমিটির মধ্যে জাতীয় কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সিদ্ধান্ত-নির্ধারণী ভূমিকা পালন করা, নির্বাহী কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করা এবং পরামর্শক কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে সুপারিশ প্রদান করা। এখানে খুব সচতুরভাবে তিন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসবনব্যবস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে কোনো সিদ্ধান্ত নির্ধারণী ভূমিকায় রাখা হয়নি। এসব পরিষদকে রাখা হয়েছে কেবল পরামর্শক ও সুপারিশ প্রদানের মতো গৌণ ভূমিকায়।
আরো উল্লেখ্য যে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানদেরকে পরামর্শক কমিটিতে রাখা হলেও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানকে সচুতরভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পরিবর্তে চেয়ারম্যানের প্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে। অপরদিকে বিএনপি সরকার গঠনের পর এখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি, টাস্কফোর্স ও ভূমি কমিশন পুনর্গঠন করা হয়নি। কিন্তু সেসব কমিটির চেয়ারম্যানদেরকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে কর্মকৌশল প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত-নির্ধারণী ভূমিকায় রাখা হয়েছে জাতীয় কমিটি ও নির্বাহী কমিটির হাতে। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩টি পার্বত্য জেলা নিয়ে কর্মকৌশল নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় কমিটিতে মন্ত্রীপরিষদের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং প্রশাসনিক বিভাগ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ের উপর সরকার ব্যবস্থার দুই-তৃতীয়াংশ নিয়োজিত করেছে। এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে জাতীয় ও নির্বাহী কমিটিতে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে দেশের কোনো জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে কমিটিতে এভাবে সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের রাখা হয় না। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রাধান্য ও গুরুত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। বলাবাহুল্য, ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটি এবং ২০০১ সালে সরকার গঠনের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি গঠন করেছিল, যা ছিল একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ।
কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এই ধরনের সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেয়ার পেছনে বিএনপি সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে একটি রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি সামরিক বা নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পরিবর্তে তথাকথিত পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
আরো গভীর উদ্বেগজনক যে, নির্বাহী কমিটির কার্যপরিধিতে “পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে প্রচলিত আইন, চুক্তির শর্ত ও বিধি-বিধান পর্যালোচনাপূর্বক প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কার এবং নতুন আইন ও বিধি-বিধান প্রণয়ন” করার বিধান রাখা হয়েছে। জনসংহতি সমিতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ তথা জুম্ম জনগণের মতামত ব্যতীত পার্বত্য চুক্তির কোনো শর্ত ও বিধি-বিধান, প্রচলিত আইন সংশোধন ও সংস্কার করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিশ্চিত জটিল ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং স্থানীয় জুম্মদের মানবাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার হমকির মুখে পড়বে।
বস্তুত সরকারের উক্ত উদ্যোগ থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক সামরিকায়নের মাধ্যমে ফ্যাসীবাদী কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের নীতি গ্রহণ করতে চলেছে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক সমস্যা এবং এই রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবেই সমাধানের নীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে সরকার হঠাৎ করে এ ধরনের কমিটি গঠন করায় জনমনে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে জানতে চাচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সরকার কী করতে চলেছে? অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, এ ধরনের কমিটি গঠনের ফলে এবং সন্ত্রাস, বিচ্ছিন্নতাবাদ, নিরাপত্তা ইত্যাদির আলোকে পার্বত্য সমস্যা দেখার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে আরো জটিল করে তুলবে। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার ক্ষেত্রে নেতিবাচক বৈ ইতিবাচক কোনো ফল বয়ে আনবে বলে মনে করা যায় না।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। এই চুক্তি ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে সম্পাদিত হলেও তা খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার (১৯৯১-১৯৯৫) কর্তৃক জনসংহতি সমিতির সাথে অনুষ্ঠিত ১৩ দফা আনুষ্ঠানিক বৈঠকের ধারাবাহিকতারই ফসল।
অন্যদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের পর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় বিএনপি সরকার (২০০১-২০০৬) চুক্তি বাতিল না করে কিছু বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেসময় বিএনপি সরকার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি’ গঠন করে এবং পার্বত্য জেলা পরিষদে ২০০৬ সালে ‘জেলা ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়’ এবং ‘রাঙ্গামাটি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইসস্টিটিউট’ দু’টি বিষয়/কার্যাবলী হস্তান্তর করে চুক্তি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবং রেইনবো নেশন নীতির ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় আসীন তারেক রহমানের নেতৃত্বে এবারের বিএনপি সরকার জুম্মদের প্রতি অধিকতর গণতান্ত্রিক ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে– এটা সকলেরই প্রত্যাশা।