হিল ভয়েস, ২১ জুন ২০২৬, খাগড়াছড়ি: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পুনঃগঠন, প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিনকে অন্যত্র পদায়ন করাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী একজন পাহাড়ি ব্যক্তিকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে- খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ রবিবার (২১ জুন) সকাল ৯:৩০ ঘটিকায় খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে ‘খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে এই কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
সাংবাদিক চাইথোয়াই মারমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, প্রজ্ঞা জ্যোতি চাকমা, চৌধুরী বেলাল, মং মারমা, অষিমা নন্দ ভিক্ষু, নব কুমার চাকমা, পরিনীতা দেওয়ান ও উক্রাচিং মারমাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
এই সময় বক্তারা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও জনগণের স্বার্থরক্ষায় দীপেন দেওয়ানের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তাকে পুনরায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে মীর মোহাম্মদ হেলালউদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
তারা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি বিশেষ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন জটিলতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে ।

পরবর্তীতে এই মানববন্ধন শেষে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
উক্ত স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয়ভাবে এ অঞ্চলের সমস্যাকে একটি রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে একটি বিশেষ শাসনব্যবস্থা হিসেবে পরিচালনার কথা থাকলেও এখনো তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
স্মারকলিপিতে আরো উল্লেখ করা হয়, পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে অনুষ্ঠিত না হওয়া এবং চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন কার্যাবলি হস্তান্তর না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এই অঞ্চলে নানা ধরনের জটিলতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খন্ডের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে একজন পাহাড়ি মন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। সেই বিবেচনায় প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে চুক্তির চেতনা ও বিধানের পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়, রাঙ্গামাটি-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান ১ জুন ২০২৬ তারিখে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেও তার পদত্যাগের প্রকৃত কারণ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন মহল ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি; বরং তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়ে থাকতে পারে। এ কারণে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং চুক্তি বাস্তবায়নে দীপেন দেওয়ানের প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। তাই তার পদত্যাগের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

এছাড়াও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা সংরক্ষণের জন্য ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে সেই বিশেষ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। কিন্তু চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যার স্থায়ী সমাধান ও বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।
এইসময় স্মারকলিপিতে নিমোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করা হয়-
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন পাহাড়ি ব্যক্তিকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রদান এবং অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করে তাকে পুনরায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিধান অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন পাহাড়ি পূর্ণমন্ত্রী নিয়োগ এবং চুক্তির আলোকে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।