হিল ভয়েস, ৪ মে ২০২৬, রাঙ্গামাটি: আজ (৪ মে ২০২৬) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির ৬ষ্ঠ সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
“সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে ইস্পাতদৃঢ় জুম্ম জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি, জুম্ম জাতির অধিকারের সনদ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন জোরদার করুন” শ্লোগানে আজ সকাল ৯.৩০ ঘটিকায় ৩২ নং বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত উগলছড়ি মুখ (বটতলা) কমিউনিটি সেন্টারে উক্ত সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সভাপতি লক্ষীমালা চাকমার সভাপতিত্বে এবং মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক শান্তনা তালুকদারের সঞ্চালনায় সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সভাপতি পুলকজ্যোতি চাকমা।
এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আশিকা চাকমা, জ্যোতিষ্মান চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির রাঙামাটি জেলা কমিটির প্রতিনিধি সন্ধ্যা চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাঘাইছড়ি থানা শাখার সভাপতি চিবরন চাকমা এবং যুব সমিতির সুমেধ চাকমা প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলকজ্যোতি চাকমা বলেন, পৃথিবীতে যেকোনো বড় মহৎ কর্ম সম্পাদন করতে হলে শুধুমাত্র পুরুষদের দ্বারা সম্ভব নয়, সেটা এম এন লারমা সেই সময়ে বুঝতে পেরেছিলেন।
তাই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠার পরপরই জুম্ম জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে জুম্ম নারী সমাজকে সামিল করার উদ্যোগ হাতে নেন। আজকে তারই ফসল হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি।
তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আজ তিন মাসের অধিক অতিক্রান্ত হলেও আজকে জুম্ম জনগণ সামগ্রিক পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। পার্বত্য চুক্তি নিয়ে এখনো আশাব্যঞ্জক হওয়ার মত খবর পার্বত্যবাসী পাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, জুম্ম জনগণের অবস্থান আজকে স্বচ্ছ আয়নার মত খুবই পরিষ্কার। বিগত সরকারগুলোর প্রতারণা-বঞ্চনা থেকে তারা অনেককিছু শিক্ষা পেয়েছে, শিক্ষা নিয়েছে। এবারও যদি তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পূরণ না হয় তাহলে ইতিমধ্যে তারা বিকল্প হিসেবে যে পথ বেছে নিয়েছে, সে পথেই এগোবে।
বিশেষ অতিথি আশিকা চাকমা বলেন, জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত এম এন লারমাদের নিজের হাতে গড়া সংগঠন এই মহিলা সমিতি। সত্তর-আশি দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামন্তীয় সমাজব্যবস্থা, পুরুষের আধিপত্য ও পারিবারিক দাসত্ব থেকে জুম্ম নারী সমাজের মুক্তির অভিপ্রায়ে তিনি ১৯৭৫ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি নাম দিয়ে জুম্ম নারীদের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তিনি বলেন, আমাদের সমাজের অর্ধেক শক্তি হচ্ছে জুম্ম নারীরা। কাজেই এই শক্তি যদি সংগ্রামী না হয়, সমাজের যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়, অধিকার সচেতন না হয়, তাহলে জুম্ম সমাজের জাতীয় অগ্রগতি ত্বরান্বিত হতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বের সম্মিলিত প্রয়াসে আজকে জুম্ম নারীরা সেই ঘরকুনো বাস্তবতার অন্ধকার গহ্বর থেকে বেড়িয়ে আন্তজার্তিক পর্যায়ে জুম্ম জনগণের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে, এটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের এবং গৌরবের বিষয়। তবে এর বিপরীত চিত্রও আমাদের সমাজে এখনো আমরা প্রত্যক্ষ করি।
আশিকা চাকমা আরও বলেন, আমাদের সমাজে আজও অনেক জায়গায় শ্রমের মজুরির ক্ষেত্রে নারীদের বেলায় ব্যপক বৈষম্য দেখা যায়। আজও অনেক জায়গায় কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে পুরুষকে যে পরিমাণ অর্থ দেয়া হয়, নারীকে সেই পরিমাণ অর্থ দেয়া হয় না। আমাদেরকে সমাজ বিদ্যমান সেই অসঙ্গতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
পিসিপির প্রতিনিধি চিবরন চাকমা বলেন, জুম্ম তরুণ সমাজের একটি অংশ আজ মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়া ও বিভিন্ন খারাপ কাজে নিজেদের মূল্যবান তারুণ্যের অপচয় করে যাচ্ছে। অন্য আরেকটি অংশ সমাজ ও জাতির প্রতি সম্পূর্ণ দায়সারা ভাব নিয়ে নিজেদের সম্ভাবনাময় সময়কে অপচয় করে যাচ্ছে। এই চিত্রটা আমাদের জন্য মোটেও শুভকর নয়। জুম্ম জাতীয় জীবনের জন্য এটি একটি ঘোর অশনিসংকেত।
তিনি বলেন, এখন থেকে যদি সমাজে থাকা শিক্ষিত, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রগতিশীল অংশটি বিপথে যাত্রারত ও নিজেদের চিন্তা-বুদ্ধি-বিবেককে বাক্সবন্দী করে রাখা সেই তরুণদের জুম্ম জনগণের সামগ্রিক কল্যাণের অগ্রযাত্রায় সামিল করতে এগিয়ে না আসে তাহলে আমরা আরও বহুযুগ পিছিয়ে পড়বো।
অধিবেশন শেষে পুনরায় লক্ষীমালা চাকমাকে সভাপতি, শান্তনা তালুকদারকে সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিসোনা চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির বাঘাইছড়ি থানা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
নবনির্বাচিত কমিটির নেতৃবৃন্দকে শপথ বাক্য পাঠ করান মহিলা সমিতির রাঙামাটি জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মানবিকা দেওয়ান। সবশেষে সম্মেলন ও কাউন্সিলের সভাপতি বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।