হিল ভয়েস, ২৮ জুন ২০২৬, রাঙামাটি: “সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে নারী সমাজ অধিকতর সামিল হউন”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ) বাঘাইছড়ি থানা শাখার চতুর্থ সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ ২৮ জুন ২০২৬, রবিবার সকাল ১০.০০ ঘটিকায় বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের উগলছড়ি মুখ (বটতলা) কমিউনিটি সেন্টারে এ সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
হিল উইমেন্স ফেডারেশন বাঘাইছড়ি থানা শাখার সহ-সভাপতি সুমনা চাকমার সভাপতিত্বে সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সভাপতি পুলকজ্যোতি চাকমা।

এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাঘাইছড়ির যুব সমিতির নেতা সুমেধ চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শান্তনা তালুকদার, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ম্রানুচিং মারমা ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের বাঘাইছড়ি থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলকজ্যোতি চাকমা বলেন, এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে আমাদের জুম্ম নারীরা অনেক বেশি শিক্ষিত, অধিকার-সচেতন, অধিকার আদায়ে সোচ্চার এবং প্রতিবাদী। কিন্তু এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেও কোথায় যেন একটি বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। আমি লক্ষ্য করি, উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর নিজ সমাজ ও নীড়ে ফিরে এসে জাতির কল্যাণে নিজেদের সম্পৃক্ত করার প্রবণতা, কিংবা জুম্ম জাতির জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনো খুবই সীমিত।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পুরুষদের ক্ষেত্রেও সামগ্রিক চিত্রটি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। জুম্ম তরুণদের একটি বড় অংশ আজ উচ্চশিক্ষিত হয়ে কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন গুছিয়ে তুলতেই ব্যস্ত। অথচ বর্তমান বাস্তবতা এবং জাতির এই সংকটময় সময়ে জুম্ম জাতির অস্তিত্ব, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাদের জ্ঞান, নেতৃত্ব ও অবদান সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ম্রানুচিং মারমা বলেন, সমাজে নারীদের শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ রাখার পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীরাও অজান্তেই নিজেদের মধ্যে লালন করছেন, যার ফলে নারীদের ওপর নির্যাতন ও বৈষম্যের ঘটনা ঘটছে। তাই নারী-পুরুষ সবার চিন্তাচেতনার পরিবর্তন প্রয়োজন। বাঘাইছড়ির নিউ লাল্যঘোনা গ্রাম থেকে উঠে আসা অকুতোভয় নেত্রী কল্পনা চাকমার কথা স্মরণ করে তিনি নবাগত নেতৃত্বকে আদর্শ, সাহস ও ত্যাগের মাধ্যমে কল্পনা চাকমার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার আহ্বান জানান।
একই সুর মিলিয়ে বাঘাইছড়ি যুব সমিতির নেতা সুমেধ চাকমা বলেন, বাঘাইছড়ির মাটিতেই অধিকার আদায়ের অমিত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। তিনি বিশ্বাস করেন এই মাটি থেকে আবারও শত শত কল্পনা চাকমা জন্ম নেবে যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের লড়াইকে বেগবান করবে।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) বাঘাইছড়ি থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা তাঁর বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি কুচক্রী মহল জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত মহান নেতা এম এন লারমা এবং তাঁর সংগ্রামকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। তবে এম এন লারমাকে বাদ দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনা অসম্পূর্ণ। তিনি তরুণ ও যুব সমাজকে সঠিক দিশা খুঁজে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির ঘোষিত বৃহত্তর আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
সম্মেলন ও কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে সুমনা চাকমাকে সভাপতি, ভূমিকা চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক এবং জ্যোসি চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট হিল উইমেন্স ফেডারেশনের বাঘাইছড়ি থানা শাখার নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়।
নবনির্বাচিত কমিটিকে শপথবাক্য পাঠ করান হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এলি চাকমা। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিদায়ী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জ্যোসি চাকমা।