Tuesday, 22 Sep 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম August 15, 2026

বাঘাইছড়ির শিজকে পিসিপির মতবিনিময় সভা: শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মাদক নিয়ন্ত্রণে ৬ দফা সিদ্ধান্ত

হিল ভয়েস, ১৫ আগস্ট ২০২৬, রাঙামাটি: রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ির শিজকে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ছাত্র-যুবসমাজকে অপসংস্কৃতি ও মাদক থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬ পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) বাঘাইছড়ি থানা শাখার উদ্যোগে উপজেলার শিজক মুখ উচ্চ বিদ্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

পিসিপি বাঘাইছড়ি থানা শাখার সভাপতি চিবরন চাকমার সভাপতিত্বে এবং সহ-সভাপতি উদ্দীপন চাকমার সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) রাঙামাটি জেলা কমিটির সাবেক সদস্য উৎপলাক্ষ চাকমা।

‎এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিজেএসএস বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সভাপতি পুলকজ্যোতি চাকমা, সারোয়াতুলি ইউনিয়নের সম্মানিত ইউপি চেয়ারম্যান অতুলবিহারী চাকমা, শিজক মুখ উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাগরচাঁন চাকমা ও ৩৮৪ নং সারোয়াতুলি মৌজার কার্বারি সুকর্ন চাকমা প্রমূখ। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন পিসিপি শিজক কলেজ শাখার সভাপতি জগৎ আলো চাকমা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উৎপলাক্ষ চাকমা বলেন, “এবারের এসএসসি পরীক্ষায় রাঙামাটি জেলার মধ্যে বাঘাইছড়ি উপজেলায় পাসের হার সবচেয়ে কম, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হতাশার বিষয়। এর দায় উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিস এড়াতে পারে না। দীর্ঘদিনের নজরদারির অভাব, পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের দায়িত্বশীলতার ঘাটতিই এই পতনের কারণ। তাই এই ফলাফলকে কেবল একটি পরীক্ষার ফল হিসেবে না দেখে, বাঘাইছড়ির সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।”

পাশাপাশি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ‘আদিবাসী নেই’ এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিএনপি নির্বাচনের আগে ‘রেইনবো নেশন’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন দেশের ৫০টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে নিজেদের সঙ্গেই প্রতারণা করছে।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সারোয়াতুলি ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান অতুলবিহারী চাকমা বাঘাইছড়িকে ‘মাদক সাম্রাজ্য’ উল্লেখ করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কার্বারি, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।

পিসিজেএসএস বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সভাপতি পুলকজ্যোতি চাকমা সতর্ক করে বলেন, “বর্তমান ছাত্র ও যুব সমাজ হচ্ছে আমাদের জাতির ও সমাজের মেরুদণ্ড। তারা যদি মোবাইল গেম, মাদক ও অপরাধে জড়ালে জাতীয় অগ্রগতি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা আরও অনেক পিছিয়ে যাবো। তাই এখন থেকে ছাত্র-যুবসমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। তাদের সঠিক দিশা দেখাতে হবে।”

অন্যদিকে, শিজক মুখ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাগরচাঁন চাকমা ফলাফলের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে বলেন, এবার আমাদের শিজক মুখ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের হার অন্যান্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। আমি মনে করি, এর দায়ভার আমারও রয়েছে।শিক্ষার মানোন্নয়নে গৃহীত উদ্যোগগুলো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমনটা হয়েছে। তবে আগামীতে যেন এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

একই সঙ্গে তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, সন্তানকে শুধু বিদ্যালয়ে পাঠিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ না করে তার নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া, যথাযথভাবে ক্লাস করা, পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া এবং কোনো খারাপ সঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রেখে সন্তানদের পড়াশোনা ও সার্বিক বিষয়ে নজর রাখার জন্য তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানের শেষভাগে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে এক মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:

১। শিজক কলেজ ও শিজক মুখ উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন দোকানে ১৮ বছরের কম বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে মাদক কেনাবেচা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে।

২। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান নিশ্চিত করা।

৩। বিদ্যালয় সংলগ্ন মাঠ, আগর বাগান ও আশপাশের এলাকায় অহেতুক আড্ডা, মাদক সেবন, মোবাইল গেম ও অনলাইন জুয়া খেলা থেকে বিরত থাকা।

৪। সন্তানদের পড়াশোনা ও উপস্থিতির খোঁজখবর নিতে অভিভাবকদের সপ্তাহে অন্তত একদিন শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা।

৫। এসএসসি-তে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ করা এবং তাদের হতাশা কাটিয়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পৃথক কাউন্সেলিং, উৎসাহ ও উপদেশমূলক পরামর্শ প্রদান করা।

৬। স্কুল পালানো শিক্ষার্থীদের বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া এবং সন্তানের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা।‎

মুক্ত আলোচনা শেষে সভাপতি চিবরন চাকমার সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে সভার সমাপ্তি ঘটে। সভায় এলাকার হেডম্যান-কার্বারি, স্থানীয় মুরুব্বি ও বিদ্যালয়সংলগ্ন ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।