হিল ভয়েস, ৪ মে ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সম্প্রতি বাংলাদেশের আদিবাসী প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বক্তব্য প্রদান করেন। আদিবাসী প্রতিনিধিদের এইসব বক্তব্যো প্রেক্ষিতে সেটেলার সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ঢাকায় প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করে। সেটেলারদের উক্ত মিছিলের প্রতিক্রিয়ায় গত শনিবার (২ মে) কানাডা ভিত্তিক সিএইচটি ইন্ডিজেনাস পিপলস কাউন্সিল অব কানাডা (সিএইচটিআইপিসিসি) সেটেলারদের এইসব মিছিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং প্রীতিবিন্দু চাকমার স্বাক্ষরসহ একটি চিঠি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের নিকট পেশ করে।
সিএইচটিআইপিসিসি তাদের চিঠিতে জানায়, জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশন ২০ এপ্রিল থেকে ১ মে ২০২৬ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগণ এবং বাংলাদেশের সমতল জেলাগুলোর আদিবাসী প্রতিনিধিরা এতে অংশগ্রহণ করেন। তারা বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন, সাইড ইভেন্টে অংশ নেন, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেন।
জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের হলো বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগণের একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব সমস্যাবলী সম্পর্কে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সরকারও উপস্থিত থাকে, অর্থাৎ সেখানে সকলেরই কথা বলার অধিকার রয়েছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের আদিবাসী প্রতিনিধিরা এই অধিবেশনে অংশ নিতে গিয়ে ভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তারা যখন জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন বাঙালি ও সেটলাররা পার্বত্য চট্টগ্রামে রাস্তায় নেমে তাদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। তাদেরকে মিথ্যাচারকারী আখ্যা দেওয়া হয় এবং তাদের বক্তব্যকে উসকানিমূলক বলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার অভিযোগ আনা হয়।
অনেক বাঙালি ও সেটলার অংশগ্রহণকারীদের বিকৃত ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে তাদের দেশদ্রোহী বলে অভিহিত করে, তাদের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানায় এবং গ্রেপ্তারের আহ্বান জানায়। তাদের অপরাধী হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। এতে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া অংশগ্রহণকারীদের জন্য এটি একটি গুরুতর হুমকি ও বিপদের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দেয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা- রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এবং ঢাকায় যথাক্রমে ২৪, ২৫, ২৫ ও ২৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাঙালি ও সেটলারদের দ্বারা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে যে, এসব মিছিলের পেছনে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর উস্কানিমূলক ভূমিকা ছিল।
উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দলে একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন, যার নাম লেফটেন্যান্ট কর্নেল শরফুদ্দিন হিমেল। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রায়ই সেনা সদস্যরা থাকেন এবং তারা বক্তব্য প্রদানকারী ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করেন বা আদিবাসীদের বিভিন্ন কার্যক্রম অনুসরণ করেন- যা পূর্বেও আপনাদের অবগত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে, সিএইচটিআইপিসিসি মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতি আহ্বান জানায়, যেন তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চানÑকেন আদিবাসী প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হন; ভবিষ্যতে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে কোনো সামরিক সদস্যকে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে না পাঠানোর জন্য; কোনো ধরনের মিছিল-সমাবেশ থেকে বিরত থাকার জন্য; এবং বাংলাদেশে ফিরে আসা অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
সিএইচটিআইপিসিসি’র এই চিঠির অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক স্পেশ্যাল র্যাপোর্টিউর, জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের সচিবালয়, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক বিভাগের প্রধান, ওএইচসিএইচআর এবং জাতিসংঘের রাজনৈতিক ও শান্তিগঠন বিষয়ক বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে।