হিল ভয়েস, ১২ জুন ২০২৬, বান্দরবান: কল্পনা চাকমা অপহরণের ৩০ বছর উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি, বান্দরবান জেলা কমিটি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন, বান্দরবান জেলা কমিটির যৌথ উদ্যোগে আজ ১২ জুন ২০২৬ সকাল ১০ ঘটিকার সময়ে বান্দরবান প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে ‘জুম্ম নারীর উপর সহিংসতা বন্ধ করাসহ কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার সুনিশ্চিত করতে হবে এবং অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করার দাবিতে’ এক মানববন্ধন আয়োজন করা হয়।
এই সময় মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেলা কমিটির সহ ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক থোয়াইক্যজাই চাক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের বান্দরবান পার্বত্য জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক ক্যসাংমং মারমা, মানবাধিকার কর্মী জন ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি বান্দরবান জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সিংমেউ মারমা, পিসিপির বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি উশৈহ্লা মারমা প্রমুখ।
হিল উইমেন্স ফেডারেশন বান্দরবান জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদিকা এনু মারমা সঞ্চালনায় উক্ত মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশন বান্দরবান, জেলা কমিটির সভাপতি উলিসিং মারমা এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন একই সংগঠনের সদস্য মেসাই মারমা।

মানববন্ধনে থোয়াইক্যজাই চাক বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণের ৩০ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজও এ ঘটনার বিচার সম্পন্ন হয়নি। এই দীর্ঘ বিচারহীনতার প্রতিবাদ জানাতেই মানুষ আজ এখানে সমবেত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ বারবার বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এছাড়াও ধর্ষণ, অপহরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিভিন্ন ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা যায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ক্যসামং মারমা বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তিনি দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার অবসান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান।
জন ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা প্রদানের পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে অন্যায়, অবিচার, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সংগ্রাম হলো অস্তিত্ব রক্ষা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। কোনো শক্তি বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এই আন্দোলনকে দমিয়ে রাখা যাবে না। রাষ্ট্র হয়তো ভেবেছিল কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে জুম্ম জাতির কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা যাবে। কিন্তু অপহরণের ৩০ বছর পরও আজ আমরা ন্যায়বিচারের দাবিতে একত্রিত হয়েছি। এটাই প্রমাণ করে যে কল্পনা চাকমার আদর্শ এবং আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে দমন করা সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন ও সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। আমরা অপহরণের ভয় পাই না, মৃত্যুর ভয়ও পাই না; কারণ আমরা ন্যায়বিচার ও মর্যাদার জন্য লড়াই করছি। সর্বোপরি, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে এখানকার জনগণের কথা শুনতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সিংমেউ মারমা বলেন, কল্পনা চাকমা শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক। তাঁকে অপহরণের মাধ্যমে একটি কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর আদর্শ ও চেতনা আজ হাজারো মানুষের মধ্যে বেঁচে আছে। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম কল্পনা চাকমার আদর্শ ধারণ করে অধিকার ও ন্যায়বিচারের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে এবং কোনো শক্তিই তাদের থামিয়ে রাখতে পারবে না।
উশৈহ্লা মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চললেও আজও বহু ঘটনার বিচার হয়নি। বারবার বিচার চাওয়া হলেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক কল্পনা চাকমা। যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা অথচ রাষ্ট্র আজও সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

উলিসিং মারমা বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণের ৩০ বছর পার হলেও আমরা এখনও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে গুম, অপহরণ, হত্যা এবং নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা এখনও ঘটছে। যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার পক্ষে কথা বলেন, এমনকি বাংলাদেশের সর্বত্র অন্যায়-শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন, তাদের অনেক সময় বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বিপুল সংখ্যক সেনা ক্যাম্প রয়েছে। অথচ একটি রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর মূল দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বহিরাগত আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করা। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে জুম্ম জনগণের জীবন, ভূমি ও অধিকারকে নিয়ন্ত্রণের একটি বাস্তবতা হিসেবে কাজ করছে। আমরা বিশ্বাস করি, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধান দমন-পীড়নের মাধ্যমে নয়; বরং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, ন্যায়বিচার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব।