হিল ভয়েস, ২২ মে ২০২৬, রাঙ্গামাটি: আজ শুক্রবার (২২ মে) রাঙ্গামাটিতে শহীদ ছাত্রনেতা মংসচিং মারমার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ❝মংচসিং মারমার রক্ত বৃথা যেতে দিবো না।❞-স্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) উদ্যোগে এক স্মরণসভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উক্ত স্মরণসভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অন্তর চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য কবিতা চাকমা প্রমুখ।
পিসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক অন্বেষ চাকমার সঞ্চালনায় স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সহ-সভাপতি সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা।
শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
এই সময় অন্তর চাকমা বলেন, জুম্ম জনগণের জাতীয় মুক্তির আন্দোলন-সংগ্রামকে নস্যাৎ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে শাসকগোষ্ঠী তার নীলনকশা ও ষড়যন্ত্র প্রতিনিয়ত চলমান রেখেছে। তার অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত ও দুর্বল করতে ইউপিডিএফের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্মলাভ। জন্মলগ্ন থেকে তারা প্রত্যাগত শান্তিবাহিনী সদস্যদের অপহরণ, গুম ও হত্যার মধ্যে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বজায় রেখেছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনকে বেগবান করতে যারাই সমর্থন যুগিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ইউপিডিএফ নানাভাবে হুমকি, অপহরণ, হত্যার মতো হীন কার্যকলাপ আজ অবদি অব্যাহত রেখেছে।
তিনি আরো বলেন, মংসচিং মারমার মতো আমাদের বহু সহযোদ্ধা তাদের জীবনকে বলি দিয়ে সামগ্রিক আন্দলনকে বেগবান করতে অবদান রেখেছেন। আমাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা হবে লড়াই-সংগ্রাম সফল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই জারি রাখতে হবে। মংসচিং মারমার মতো বীর নেতাদের রক্তকে আমরা বৃথা যেতে দিতে পারিনা। জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর বলিদানকে আমরা সার্থক করে তুলবোই। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে যারাই বাধাগ্রস্ত করবে তাদেরকে প্রতিহত করতে ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
কবিতা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো জুম্ম জনগণের মাঝে বিভেদ জারি রেখেছে। তাদের হাতে মংসচিং মারমার মতো বহু ছাত্রনেতাকে বলি হতে হয়েছে। ২০২৪ সালে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দুইজন নেত্রীকে অপহরণের মাধ্যমে তাদের মুখোশ জনগণের সামনে আরেকবার উন্মোচিত হয়।
তিনি আরও বলেন, জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরেও তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। বর্তমান অবদি তারা তাদের নানাবিধ ষড়যন্ত্র জারি রেখেছে। ইউপিডিএফের অপকর্ম ও নোংরা রাজনীতির কারণে জুম্ম জনগণের জাতীয় মুক্তির আন্দোলন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মংসচিং মারমার শাহাদাৎ বরণের শোককে শক্তিতে পরিণত করে জুম্ম ছাত্র সমাজকে একতাবদ্ধ করে আন্দোলন চালিয়ে নিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ২০১২ সালের ইউপিডিএফ কর্তৃক নৃশংস গ্রেনেড হামলার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী আমি নিজেই। চুক্তিবিরোধী এই গোষ্ঠী ২০০১ সালে তিন বিদেশীকে অপহরণের মাধ্যমে পাহাড়ে নতুন করে সেনাশাসনের বৈধতা দিয়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী অপহরণের মতো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ তারা পরিচালনা করেছে। তাদের কার্যকলাপ রুখে দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন জোরদার করার গুরু দায়িত্ব এই ছাত্র সমাজকেই নিতে হবে। জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যতজন শহীদ হয়েছেন তাদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবেনা। সকল যুব ছাত্র সমাজকে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য সমাপ্ত করেন।
সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আয়োজিত স্মরণসভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে।
এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ২নং গেইট শাখার উদ্যোগে শহীদ ছাত্রনেতা মংচসিং মারমার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্মরণসভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন আয়োজন করা হয়।

উল্লেখ্য, শহীদ ছাত্রনেতা মংচসিং মারমা পিসিপি কাপ্তাই সুইডিস পলিটেকনিক শাখার সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ২০১২ সালে পিসিপির ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অংশগ্রহণ শেষে বাড়িতে ফেরার জন্য রাঙ্গামাটির কল্যাণপুরস্থ পেট্রোল পাম্পে সহকর্মী ও বন্ধুদের অপেক্ষা করছিলেন। বিকাল আনুমানিক ৩:৩০ ঘটিকার দিকে অপেক্ষমান বাসের পাশ ঘেষে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি চলমান সিএনজি গতি কমিয়ে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী প্রসিতপন্থী ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা আকস্মিক গ্রেনেড ছুঁড়ে মেরে দ্রুত চলে যায়। এই হামলায় মংসচিং মারমা গুরুতর আহত হন। শরীর থেকে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়। সেই গ্রেনেড হামলায় মংচসিং মারমাসহ ১৩ জন সহযোদ্ধা মারাত্মকভাবে আহত হন। এতে অনেকের হাত-পা, কারোর শরীর কিংবা কারোর চোখে আঘাত প্রাপ্ত হয় এবং মাংস পিন্ড ছিটকে পড়ে। সহকর্মীরা তাদেরকে দ্রুত রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে অবস্থার অবনতি দেখে দায়িত্বরত চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার দুইদিন পর, ২২ মে ২০১২ তারিখে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মংচসিং মারমা চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।