Tuesday, 22 Sep 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম June 2, 2026

লংগদু সহিংসতার ৯ বছর: জুম্ম জনপদে বিচারহীনতার আরেক লজ্জাজনক সাক্ষ্য

হিল ভয়েস, ২ জুন ২০২৬, রাঙ্গামাটি, বিশেষ প্রতিবেদন: ২০১৭ সালের ১ ও ২ জুন রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় আদিবাসী জুম্ম সম্প্রদায়ের ওপর এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আজ সেই নৃশংস ঘটনার ৯ বছর পূর্ণ হলো। দীর্ঘ এই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন কিংবা প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কোনোটিই পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে এক প্রকার বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই দিন পার করছেন ভুক্তভোগীরা।

ঘটনার প্রেক্ষাপটঃ

২০১৭ সালের ১ জুন খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের ‘চার মাইল’ নামক স্থান থেকে নুরুল ইসলাম নয়ন নামে একজন বাঙালি মোটরসাইকেল চালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ বা তদন্ত ছাড়াই সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জুম্মদের দায়ী করা হয়।

পরদিন, অর্থাৎ ২ জুন জুম্মার নামাজের পর স্থানীয় যুবলীগ ও মুসলিম সেটেলাররা একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। অভিযোগ রয়েছে, উক্ত সমাবেশে স্থানীয় সেনা জোনের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে উপস্থিত জনতাকে উত্তেজিত করে তোলেন। এরপরই সেনা ও পুলিশের উপস্থিতিতে জুম্মদের ওপর সুসংগঠিত হামলা শুরু হয়।

হামলাকারীরা লংগদু উপজেলা সদরের তিনটিলা, মানিকজোড়ছড়া এবং বাত্যা পাড়ায় একযোগে তান্ডব চালায়। পেট্রোল, কেরোসিন এবং এক ধরনের দাহ্য গ্যাস স্প্রে করে প্রায় ২৫০টি জুম্ম পরিবারের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা হয়। এর মধ্যে তিনটিলায় ৯৪টি, মানিকজোড়ছড়ায় ৮৮টি এবং বাত্যা পাড়ায় ৪২টি ঘরবাড়ি ও দোকান ছিল।

তিনটিলা এলাকার ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা গুণমালা চাকমা আগুনে পুড়ে ঘরের ভেতরেই নির্মমভাবে মারা যান। আকস্মিক এই হামলায় প্রাণ বাঁচাতে কয়েক শত পরিবার এক কাপড়ে জঙ্গল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ঘরবাড়ির পাশাপাশি জুম্মদের গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি লুট করা হয় এবং গৃহপালিত শুকরগুলো মেরে ফেলা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় জুম্ম গ্রামবাসীরা প্রাথমিক প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়ভীতি ও গুলির হুমকির মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। উগ্রপন্থী সেটেলাররা যখন জুম্মদের ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছিল এবং মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করছিল, তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নীরব ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মামলার বর্তমান পরিস্থিতি ও বিচারহীনতাঃ

ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে কিশোর চাকমা এবং লংগদু থানা পুলিশের পক্ষে এস.আই দুলাল হোসেন বাদী হয়ে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।

মামলা ও বিচার প্রক্রিয়ার চিত্রঃ

১. ঘটনার পর কিছু আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্তমানে প্রায় সবাই জামিনে মুক্ত।

২. বৃদ্ধা গুণমালা চাকমার ডিএনএ পরীক্ষার জন্য উদ্ধারকৃত হাড়গোড় নিয়ে যাওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তার কোনো সুরাহা হয়নি।

৩. ক্ষতিগ্রস্ত জুম্মদের বিরুদ্ধে সেটেলারদের দায়ের করা দুটি ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা মামলা এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে এ পর্যন্ত জুম্ম জনগণের ওপর প্রায় ২০টিরও বেশি ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১,৬০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ১,৩৩২টি বাড়ি লুটপাট করা হয়েছে, অন্তত ১২ জন নিহত এবং অসংখ্য নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

লংগদুসহ প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এক ধরনের ‘দায়মুক্তি’ বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা পার্বত্য অঞ্চলের স্থায়ী শান্তি ও জুম্ম জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পথকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে।

লংগদু সহিংসতার ৯ বছরে দাঁড়িয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু পুনঃতদন্ত, গুণমালা চাকমার হত্যাকাণ্ডের বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর স্থায়ী ও সম্মানজনক পুনর্বাসন এবং জুম্মদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক