Tuesday, 22 Sep 2026
আদিবাসী অধিকার April 11, 2023

লোগাং গণহত্যা স্মরণে রাঙ্গামাটিতে পিসিপির উদ্যোগে আলোচনা সভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠিত

হিল ভয়েস, ১১ এপ্রিল ২০২৩, রাঙ্গামাটি: গতকাল সোমবার (১০ এপ্রিল ২০২৩) লোগাং গনহত্যার ৩১ বছর উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, রাঙ্গামাটি জেলা শাখা কর্তৃক এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

উক্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি জিকো চাকমা ও সভা সঞ্চালনা করেন পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক টিকেল চাকমা। এছাড়াও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি থোয়াইক্যা জাই চাক, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমিত্র চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য উলিসিং মারমা, পিসিপি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নরেশ চাকমা।

আলোচনা সভার শুরুতে লোগাং গণহত্যাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের ওপর সংগঠিত ১৩ টি গণহত্যায় সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার লোগাং গণহত্যার আজ ৩১ বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের জন্য শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক নিপীড়ন-নির্যাতন ও বর্বরতার এক অনন্য উদাহরণ এই লোগাং গণহত্যা। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে গণহত্যা সংগঠিত করতে না পারলেও শাসকগোষ্ঠী আজ সুকৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে উন্নয়নের নামে আজ নিজেদের ভূমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করছে।

একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলায় জুম্ম জনগণকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়ে চলেছে। বরাবরের মতোই হামলাকারীরা সেটলার বাঙালি এবং সেইসব হামলার শিকার পাহাড়িরা। বক্তারা অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটলার বাঙালি ও সেনাবাহিনী তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত গণহত্যাগুলোর বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানান।

আলোচনা সভা শেষে সন্ধ্যা ৬:৩০ টায় লোগাং গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হয়।

উল্লেখ্য যে, ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল পাহাড়ি জুম্ম জনগণের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইং, বিষু, বিহু ও চাংক্রান উৎসবের মাত্র দুই দিন আগে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ির লোগাংয়ে সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক সংঘটিত হয় এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ড। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এটি ‘লোগাং গণহত্যা’  নামে পরিচিত হয়। একটা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো বাছবিচার ছাড়াই সেনাবাহিনী, বিডিআর (বর্তমান বিজিবি), আনসার-ভিডিপির সহযোগিতায় সেটেলার বাঙালিরা এই হত্যাকাণ্ড চালায়। সেটলাররা ধারালো দা, বটি, কুড়াল দিয়ে নিরীহ আদিবাসীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সেনাবাহিনী ও বিডিআর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এ হত্যাকান্ডে শিশু, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ নর-নারী কেউ রেহায় পায়নি সেদিন। দুই শতাধিক পাহাড়ি আদিবাসী মারা যায়, অনেকে নিখোঁজ হয়। নিহতদের বেশিরভাগ লাশ নিরাপত্তা বাহিনী গুম করে ফেলে। আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয় প্রায় ৭ শ’র বেশি জুম্মদের বাড়িঘর।

ইতিহাসের বর্বরতম এই হত্যাকাণ্ডের কারণে আদিবাসী পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী প্রাণের বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইং, বিষু, বিহু ও চাংক্রান উৎসবের আনন্দ মুহূর্ত শোকে পরিণত হয়। ১৩ এপ্রিল যেদিন উৎসবে মেতে ওঠার কথা সেদিন খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে হাজার হাজার পাহাড়ি রাজপথে নেমে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করে।

আরো পড়ুন

লোগাং গণহত্যা: আদিবাসী জুম্মদের উপর সংঘটিত অন্যতম জাতিগত বর্বরতা

১০ই এপ্রিল বিডিআর, ভিডিপি, আনসারসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় সেটেলারদের দ্বারা সংঘটিত ভয়াবহতম গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইং, বিষু, বিহু ও চাংক্রান উদযাপন কমিটি কর্তৃক খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে যথাক্রমে ১২ ও ১৪ ই এপ্রিল শোক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইং, বিষু, বিহু ও চাংক্রান উৎসব বর্জন করা হয়।

ঢাকায় ১৯ এপ্রিল এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ মৌন মিছিল বের করে এবং প্রধানমন্ত্রীর নিকট একটি স্মারকলিপি পেশ করে। ২৮ এপ্রিল ১৯৯২ পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ লোগাং অভিমুখে দীর্ঘ পদযাত্রা করে। প্রতিনিয়ত সেনাবাহিনীর বাঁধা অতিক্রম করে হাজার হাজার মানুষ লোগাং পৌঁছায় এবং সেখানে ফুল দিয়ে নিহতদের সম্মান জানায়।

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান ও লোগাং হত্যাকান্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিতে ৭ মে ১৯৯২ গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য দেশব্যাপী মিছিল ও সমাবেশ করে। লোগাং গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ মানবাধিকার কমিশনে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির সমিতির প্রতিনিধি রামেন্দু শেখর দেওয়ান প্রতিবাদ জানান।

আরো পড়ুন

লোগাং গণহত্যা ২৯ বছরে: এখনও বিচারহীন

রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সেটেলারদের সংঘবদ্ধ হামলায় সংঘটিত নান্যাচর গণহত্যার ২৭ বছর

পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকায়নের ইতিবৃত্ত ও তৎপরতা