হিল ভয়েস, ১৬ আগস্ট ২০২৬, শেরপুর: শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার পূর্ব গজারীকুড়া-বন্দধারা এলাকায় এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আদিবাসী গারো (মান্দি) জনগোষ্ঠীর গ্রামে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি ঢাকা থেকে ৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ১৩ ও ১৪ আগস্ট ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করেছে।
পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দলটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে তাদের নিরাপত্তা ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। পাশাপাশি তারা ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হানিফ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক নেতা অলীক মৃ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাবেক সভাপতি এন্টনী রেমা, যুব ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও আইপিনিউজের প্রতিনিধি বেবিলন চাকমা এবং বাগাছাস নেতা সৌহার্দ্য চিরানসহ মোট আটজন সদস্য।
আইপিনিউজের প্রতিনিধি বেবিলন চাকমা বলেন, “অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের মূল ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন আবশ্যক। তবে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরীহ গারো আদিবাসীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসনকে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই উভয় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রাথমিক তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ নিচে দেওয়া হল:
১। নারগিস মানখিন: ১৫-২০ জন বাড়িতে ঢুকে বাড়ির জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র ভাঙচুর। ১টি গরু, ২টি ছাগল এবং হাঁস লুটের অভিযোগ।
২। পিটার মানখিন: ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র ভাঙচুর। ১টি গরু, ৩টি ছাগল, নগদ টাকা, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ। ( তাঁকে বর্তমানে জেলহাজতে রাখা হয়েছে। পিটার মানখিনের মেয়ে সমাপ্তি চাম্বুগংকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ )
৩। সিমন মানখিন: ঘরের আসবাবপত্র ব্যাপক ভাঙচুর, ৭টি ছাগল, স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৪। বিউটি দফো: ৪টি ছাগল, নগদ টাকা, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৫। অনিমা হাউই: সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল ভাঙচুর, ঘরের দরজা ও ভেতরের জিনিসপত্র ভাঙচুর এবং শারীরিক আক্রমণ। ২টি দেশি গরু, ৩টি ছাগল, স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৬। বীর মুক্তিযোদ্ধা লরেন্স বনোয়ারী: ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র ও দরজা ভাঙচুর। ৩টি গরু, নগদ ৫০,০০০/- টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, ৩২ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন, ১টি চার্জার ফ্যান, ১টি টর্চ লাইট, ১টি স্মার্টফোন, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
৭। শিখা চিসাম: ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র ভাঙচুর ও নারীদের উপর শ্লীলতাহানির চেষ্টা। নগদ ১,৫০,০০০/- টাকা, ৪ জোড়া কানের দুল, ১ ভরি গলার চেইন লুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী শিখা চিসামের দাবি, মৃত বিল্লালের ছেলে এ লুটপাটের নেতৃত্ব দেন।
৮। শিল্পী মানখিন(৪৬): ঘরের ভেতরের মালামাল ভাঙচুর এবং শারীরিক নির্যাতন। ২টি ছাগল, ২টি গরু, হাঁস, মুরগি, নগদ ৫০০০ টাকা, টিভি, মাছ ধরার জাল লুটের অভিযোগ।
৯। বিপোলা চিরান: ফ্রিজ, আসবাবপত্র ভাঙচুর, চাল-ডাল লুটের অভিযোগ।
১০। চিচিলা মানকিন(৬৫): দরজা, হাড়ি পাতিল ভাঙচুরের এবং চাল লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ।
১১। লাইকিওয়ে মারমা(৩৮): ৭ টি ছাগল লুটের অভিযোগ।
১২। অসীম ম্রং: ঘরের ভেতরে মারাত্মক ভাঙচুর। ১টি ষাঁড়, স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা, মূল্যবান জমির কাগজপত্র, টেলিভিশন, চাল ও ডাল লুটের অভিযোগ।
১৩। নীলু চাম্বুগং: ঘরের ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর। আনুমানিক ২০ মণ ধান/চাল, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার এবং ফ্রিজ লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ।
প্রতিনিধি দলটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক সহায়তার ব্যবস্থা করা এবং এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে।