-প্রফুল্ল
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যেমনটি সোভিয়েত বিপ্লবকালে লেলিনের পাশে একজন গোর্কির উদ্ভব ঘটেছিল, মাও সে-তুঙের পাশে অর্থাৎ চীন বিপ্লবে আবির্ভাব ঘটেছিল সু-লুনের, ভিয়েতনামে হো-চি-মিন নিজেই একাধারে বিপ্লবের নেতা ও কবি ছিলেন। লাতিন আমেরিকার দেশ কিউবা বিপ্লবের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কর্মী, চিকিৎসক, লেখক ও গেরিলা নেতা-আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। তিনি কেবল যুদ্ধই করেননি বরং বিপ্লবের আদর্শ প্রচার, সাহিত্য রচনা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার লেখনী এবং মতাদর্শ লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। আর পাহাড়ে ৭০ দশকে উদ্ভব হয়েছিল এক ঝাঁক তরুণদের নিয়ে গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী, সেই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সমাজ পরিবর্তনের ভাবাদর্শ। যে ভাবাদর্শে সক্রিয় ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেকাংশ জুম্ম শিক্ষক ও তরুণ প্রজন্ম। এই সব ঘটনা কোনো সচেতন প্রচেষ্টার ফল নয়। এটি ঐতিহাসিক প্রয়োজনে উদ্ভব হওয়া এক বাস্তবতা। যার কারণে বলা যায় বৈপ্লবিক আন্দোলন তার নিজের প্রয়োজনেই একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দাবি উপস্থিত করে।
কিন্তু সংস্কৃতি কি? সংস্কৃতির মূল কাজইবা কি?
প্রখ্যাত স্কটিশ সমাজ বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ম্যাকাইভার বলেছিলেন, ‘আমরা যা তাই আমাদের সংস্কৃতি’ অর্থাৎ মানবসমাজের জীবনধারা, চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আচরণের সামগ্রিক রূপই সংস্কৃতি। মানুষ জন্মগতভাবে সংস্কৃতিবান নয় বরং সমাজের মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে সে সংস্কৃতি অর্জন করে। তাই সংস্কৃতি মানুষের সামাজিক জীবনের একটি মৌলিক উপাদান। সমাজবিজ্ঞানে সংস্কৃতি এমন এক সমষ্টিগত জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের চিন্তা, আচরণ ও সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে।
অপরদিকে সমাজের উপরিকাঠামো রাজনীতি, দর্শন , আইন, ধর্ম, সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রের বিকাশধারা মূলগতভাবে অর্থনৈতিক বিকাশধারার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সকল বিষয় পরস্পরের উপর এবং সেই সাথে অর্থনৈতিক ভিত্তির উপরেও প্রভাব-প্রতিক্রিয়া বিস্তার করে। সমাজে অর্থনৈতিক প্রয়োজনকে ভিত্তি করেই নানান ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চলে আর এই অর্থনৈতিক প্রয়োজনই শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই থেকে বোঝা যায়, সংস্কৃতিরও নিজস্ব কাজ আছে, অর্থনৈতিক বুনিয়াদ থেকে উৎপন্ন হয়ে তা অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে রক্ষা এবং পরিবর্তিত করার ক্ষেত্রে কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করে। যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে বস্তু থেকে উৎপন্ন হয়ে মানুষের চেতনা আবার বস্তুকেই পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে।
সুতরাং মানব চেতনার একটি রূপ হিসাবে সংস্কৃতির পরিবর্তন সংঘটনকারী শক্তি আছে এবং সমাজ পরিবর্তনকারী বৈপ্লবিক কাজের অনুপূরক শক্তি হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতির কাজের ধরন আরো গভীরভাবে বুঝতে হলে জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের একটি উক্তি স্মরণযোগ্য, তাতে তিনি বলেছেন, ‘বিকাশ ধারার বিশেষ এক পর্যায়ে প্রচলিত উৎপাদন-সম্পর্ক সমূহের সংঘাত উপস্থিত হয়’। অর্থাৎ আইন, রাজনীতি, ধর্ম, নন্দন বা দর্শনগত রূপ সমূহের মধ্য থেকে মানুষ এই সংঘাত সম্পর্কে সচেতন হয় এবং সংগ্রামের মাধ্যমে সেই সংঘাতের নিষ্পত্তি করে।
একটি পরিবর্তন সময়ে সমাজের বস্তুগত পরিবেশের শোষিত ও নিপীড়িত জনগণ সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই সক্রিয়তা যদি সচেতনভাবে লক্ষ্যানুগ না হয় তবে সে সক্রিয়তা হবে স্বতঃস্ফুর্ততা-নির্ভর এক অন্ধ ক্রিয়ার তাগিদ মাত্র। শুধুমাত্র লক্ষ্যহীন স্বতঃস্ফুর্ত ক্রিয়ার দ্বারা বা অন্ধ বিদ্রোহের দ্বারা কখনও সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। সুতরাং সমাজ পরিবর্তন যুগে পরিবর্তনের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য অবশ্যই জনচেতনার যথোপযুক্ত প্রস্তুতি প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজন মেটায় সংস্কৃতিসহ গোটা ভাবাদর্শ। এই সচেতনতার জন্যই সমাজ পরিবর্তনের একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি দরকার। যার কারণে বলা হয় ‘বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লব সম্ভব নয়’। এই তত্ত্ব বা ভাবাদর্শই আমাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দর্শন, আলোচনা, চিত্রকলা, সঙ্গীত, নাটক, কাব্য-সাহিত্য ইত্যাদিতে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে চিত্রকলা, সঙ্গীত, নাটক, কাব্য-সাহিত্য প্রভৃতিতে ভাবাদর্শগত বক্তব্য শিল্পরূপে জনগণের সামনে উপস্থিত হয়। শিল্পরূপের সার্থকতা হচ্ছে এই যে তা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে তার আবেগকেও দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংগঠিত করতে পারে।
অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক আচার-আচরণ ও অভ্যাসের প্রশ্ন। কারণ সংস্কৃতি বলতে শুধু নাচ-গান, নাটক, কাব্যই বোঝায় না। সামাজিক আচার-আচরণ ও অভ্যাসও সংস্কৃতির অঙ্গ। সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের এই অভ্যাসকে বিপ্লবী স্বার্থোপযোগী করে সংগঠিত না করলে বিপ্লবকে জয়যুক্ত করা এবং বিপ্লবের পরে অর্জিত ক্ষমতাকে ধরে রাখা যায় না। এই জন্য বলা হয়, লক্ষ কোটি মানুষের আচার-অভ্যাস একটি শক্তি, এই শক্তিকে অবহেলা করা যায় না। এটি অগ্নি শিখার মতো। মানুষের স্বার্থে সংযত হলে সে প্রদীপ হয়ে আলো দেয় আর অসংযত হলে ঘর পোড়ায়।
অপরদিকে সমাজে মানুষের ‘নীতিবোধ ও মূল্যবোধ’ সংস্কৃতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সমাজ পরিবর্তনের সময়ে ক্ষমতাসীন শোষকের সঙ্গে শোষিতের যে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই হয়, তাতে শোষকের পক্ষ যারা অবলম্বন করে তারা সকলেই মোটা অঙ্কের ‘অর্থ’ পায়। কিন্তু অপরপক্ষে শোষিত যে লড়াই চালিয়ে যায় তাতে নগদ পাওনা কিছু নেই। সমাজ পরিবর্তনের বৃহত্তর স্বার্থের এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই সে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যায়। সাফল্যের জন্য সেখানে আত্মত্যাগের প্রয়োজন হয়, ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগের প্রয়োজন হয়, দীর্ঘস্থায়ী দুর্দশার মধ্যে দাঁড়িয়ে দৃঢ় বিশ্বাসে লড়াই করতে হয়। আর এই ত্যাগ ও বিশ্বাসের শক্তি যোগায় বিপ্লবী নীতিবোধ ও মূল্যবোধ। সমাজ পরিবর্তনের ক্রান্তিলগ্নেও এই বিপ্লবী নীতিবোধ ও মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যার কারণে ভাবাদর্শ ও সংস্কৃতি ছাড়া সমাজ পরিবর্তন অসম্ভব। অপরপক্ষে বললে, উপযুক্ত সংস্কৃতি ছাড়া মানব সভ্যতার সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে কোনো জনগোষ্ঠী তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করেনি-বরং সংস্কৃতি, পরিচয় ও ঐতিহ্যকে প্রতিরোধের শক্তিতে রূপান্তর করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলন সেই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখানে আন্দোলনের শক্তি শুধু সংগঠন বা রাজনৈতিক দাবিতে নয় বরং সংস্কৃতির মধ্যেও নিহিত। যখন সংস্কৃতি অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন সেই আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ে।
যার কারণে ১৯৭৩ সালে গড়ে উঠে ‘গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী’ এবং পাহাড়ে একঝাঁক তরুণদের নিয়ে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক গভীর চর্চা। সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ব জুম্ম জনগণকে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে উজ্জীবিত করার জন্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলে।
তখনকার শিক্ষিত তরুণ সমাজ গ্রামে গ্রামে ঘুরে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামিল হওয়ার জন্য জনমত গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস নয়; এটি একই সাথে সংস্কৃতি, পরিচয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের ইতিহাস। জুম্মদের আন্দোলনের পেছনে যে শক্তি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি-ভাষা, ঐতিহ্য, পোশাক, উৎসব, গান, নৃত্য এবং জীবনদর্শন।
সত্তর এবং আশির দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছিল তাদের সাংস্কৃতিক ঐক্য। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খুমী, খিয়াং, চাক, পাংখোয়া, বম, লুসাই, সাঁওতাল, অহমিয়া, গুর্খা এই ১৪ জাতিগোষ্ঠী ভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ঐতিহ্যে ভিন্ন হলেও তাদের জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। এই মিলই পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘জুম্ম’ জাতীয়তাবাদের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
তখনকার সময়ে জুম্মদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনে সংস্কৃতি তিনভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথমত, এটি জুম্মদের পরিচয় ও ঐক্যকে শক্তিশালী করেছে। দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষকে তাদের ইতিহাস ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে। তৃতীয়ত, গান, নাটক, সাহিত্য ও উৎসবের মাধ্যমে জুম্মদের আন্দোলনের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছেছে।
সেই সময় জুম্ম ছাত্রসমাজ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জোরালোভাবে উপস্থিত করেছিল। জুম্মদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা ও নাটকের মাধ্যমে মানুষকে সংগঠিত করেছিল। ফলে সংস্কৃতি শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
কিন্তু বর্তমান সময়ে পরিস্থিতি অনেকাংশে পরিবর্তিত হয়েছে। জুম্ম ছাত্রসমাজের একটি অংশের মধ্যে সংস্কৃতির গভীর চর্চার পরিবর্তে তার বাহ্যিক প্রদর্শন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃতি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের উপকরণ হিসেবে পরিণত হচ্ছে। প্রকৃত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, জুম্মদের ইতিহাস ও সংগ্রামের চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধুমাত্র পোশাক বা নৃত্যের প্রদর্শনকে সংস্কৃতি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর ফলে সংস্কৃতির রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বর্তমান জুম্ম তরুণ প্রজন্ম তাদের নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন না করেই সংস্কৃতির নামে কিছু আনুষ্ঠানিক কর্মকান্ডে সীমাবদ্ধ রয়েছে। যার প্রবণতা জুম্ম সমাজে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাব ধীরে ধীরে পড়ছে। কারণ সংস্কৃতির গভীরতা হারিয়ে গেলে জাতিগত পরিচয়ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
জুম্ম সমাজের সাংস্কৃতিক সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। রাষ্ট্র ও মূলধারার সমাজের শক্তিশালী সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করছে। ফলস্বরূপ জুম্মদের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ নিজেদের সংস্কৃতিকে পিছিয়ে পড়া বা কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে নিজেদের ভাষা ব্যবহার কমে যাচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী উৎসবের গুরুত্ব হ্রাস পাচ্ছে এবং আধুনিকতার নামে বাইরের সংস্কৃতির অনুকরণ বাড়ছে। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সরাসরি রাজনৈতিকভাবেও প্রভাব বিস্তার করে। বলাবাহুল্য যখন একটি জনগোষ্ঠী তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার অধিকার আদায়ের শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জুম্ম সমাজকে নতুনভাবে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ শুরু করতে হবে। ফলে তরুণ জুম্ম ছাত্রসমাজকে তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক শিক্ষা জোরদার করা জরুরি। সংস্কৃতিকে শুধুমাত্র বিনোদনের বিষয় না বানিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গান, সাহিত্য, নাটক ও গবেষণার মাধ্যমে আন্দোলনের ইতিহাস ও জনগণের অধিকার সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে হবে। যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এটি জুম্ম সংস্কৃতি ও ইতিহাস প্রচারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
সর্বোপরি জুম্ম জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ‘জুম্ম’ পরিচয়ের মূল শক্তি হলো বহুত্বের মধ্যে ঐক্য। এই ঐক্যকে শক্তিশালী না করলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম দুর্বল হয়ে পড়বে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের অস্তিত্বের ক্রান্তিলগ্নে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সংস্কৃতিকে যদি আবারও সচেতনতা, ঐক্য ও সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে জুম্ম জনগোষ্ঠী নতুন শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং তাদের অধিকার ও পরিচয় রক্ষার আন্দোলন আরও সুসংহত হবে।
মনে রাখা শ্রেয়, যখনি কোনো জনগোষ্ঠী তাদের সংস্কৃতিকে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে তখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে-আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী ও প্রজন্মান্তরে টিকে থাকে, রাজনৈতিক দাবি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈধতা পায়, জনগণের মধ্যে সমষ্টিগত পরিচয় ও সংহতি শক্তিশালী হয়। যার ফলে বলা বাহুল্য- সংস্কৃতি যখন অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক লড়াই থাকে না, তা হয়ে ওঠে বৃহত্তর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
এই বাস্তবতায় ‘সংস্কৃতি যখন অস্ত্র’ বাক্যটি কেবল একটি কাব্যিক অভিব্যক্তি নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সত্য। কারণ যখন একটি জনগোষ্ঠী তাদের পরিচয় রক্ষার জন্য সংস্কৃতিকে ধারণ করে, তখন সেই আন্দোলনকে সহজে থামানো যায় না, তা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য ও ন্যায়সঙ্গত।
লেখকঃ মানবাধিকার কর্মী