Tuesday, 22 Sep 2026
আদিবাসী অধিকার August 10, 2026

সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে খাগড়াছড়িতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত

হিল ভয়েস, ৯ আগস্ট ২০২৬, খাগড়াছড়ি: আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে খাগড়াছড়িতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ রোববার ৯ আগস্ট ২০২৬, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটি, খাগড়াছড়ির উদ্যোগে এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

সকাল সাড়ে ৯টায় শহরের চেঙ্গী স্কোয়ারে দৃষ্টিনন্দন সাংস্কৃতিক ডিসপ্লে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর সেখান থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মিলনপুরস্থ মারমা উন্নয়ন সংসদ মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। পরবর্তীতে সকাল ১০টায় মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।

উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক প্রীতিময় চাকমার সভাপতিত্বে এবং সুজন চাকমা ঝিমিটের সঞ্চালনায় সমাবেশে প্রধান ও বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল সুমন, লেখক ও গবেষক তানিম নওশাদ, উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক সুধাকর ত্রিপুরা, সদস্য সচিব সুদর্শন চাকমা, জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল, পানছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রত্না তঞ্চঙ্গ্যা, বাংলাদেশ জনতার সংসদের (বাজস) সভাপতি মাহফুজুর রহমান শামীম এবং ভাষা গবেষক খায়রুল নাহার ইস্পিতা।

সমাবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল সুমন বলেন, “শিক্ষা ও খেলাধুলাসহ দেশের সর্বক্ষেত্রে আদিবাসীদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে আন্দোলন ও ন্যায্য দাবিদাওয়াগুলো জারি রাখতে হবে।” পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে প্রচারিত বিচ্ছিন্নতাবাদের খবরের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বললেই মিডিয়ায় প্রায়ই বিচ্ছিন্নতার কথা তুলে ধরা হয়, যা অনুচিত।”

লেখক ও গবেষক তানিম নওশাদ আদিবাসীদের পরিচয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আদিবাসী মানেই অমুসলিম- এই ধারণা ভুল, কারণ পাঙাল আদিবাসীরাও মুসলমান। আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিলে দেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বলে এক ধরনের প্রোপাগান্ডা চালানো হয়।”

তিনি আরও যোগ করেন, “বাঙালি জাতির উৎপত্তির ইতিহাসে কোচ, মুন্ডা ও সাঁওতালদের রক্তের প্রবাহ রয়েছে।” রাষ্ট্রকে আদিবাসীদের পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক সুধাকর ত্রিপুরা পার্বত্য চুক্তির প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা দেশের অখণ্ডতাকে স্বীকার করেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করেছি। কাজেই আমাদের ওপর বিচ্ছিন্নতার ট্যাগ লাগানো বন্ধ করতে হবে। কাউকে পেছনে ফেলে বা অবদমিত করে সমাধান সম্ভব নয়।”

তিনি অনতিবিলম্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানান।

সমাবেশের অন্যান্য বক্তারা বলেন, দেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা জরুরি। তারা আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা চান।

আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠিত হয় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, যেখানে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিল্পীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গান পরিবেশন করেন। কর্মসূচি থেকে বক্তারা তাদের মৌলিক অধিকার আদায়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।