হিল ভয়েস, ১৭ আগস্ট ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আজ ১৭ আগস্ট, এই দিনটিকে ভারতের আসাম রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটিতে চাকমা জনগোষ্ঠী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালিত হয়েছে। এই উপলক্ষে গুয়াহাটির পিডাব্লিউডি অডিটোরিয়ামে “ভারতের বিভাজন: চাকমা জনগোষ্ঠীর জন্য কালো দিবস এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে উদীয়মান উদ্বেগ” শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে এক জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি, গবেষক, আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতা, শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী, লেখক এবং নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশ নেন। অতিথিদের অভ্যর্থনা, মোমবাতি প্রজ্বালন, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। CTRA-এর পরিচালক ড. শ্যামল বিকাশ চাকমা অনুষ্ঠানের পরিচিতি পর্ব পরিচালনা করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আসাম সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ও ট্রাইবাল বিষয়ক মন্ত্রী শ্রী রানোজ পেগু এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আসাম সরকারের হ্যান্ডলুম, টেক্সটাইলস ও সেরিকালচার, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ এবং আদিবাসী ও ট্রাইবাল বিশ্বাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী শ্রী বিশ্বজিৎ দাইমারি। এছাড়া ইন্টেলেকেচুয়াল ফোরাম অব নর্থ ইস্ট-এর সহ-সভাপতি শ্রী রাজর্ষি নেওগ বক্তব্য দেন। পাশাপাশি জনগণ টিভি-এর নিউজলেটার “Sallyeng” প্রকাশ করা হয় এবং চাকমা সম্প্রদায়ের শিল্পীরা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করেন।
বিকেলের অধিবেশনে অল আসাম চাকমা সোসাইটির সভাপতি আশুতোষ চাকমা ও অল ইন্ডিয়া চাকমা স্টুডেন্টস’ ইউনিয়নের সভাপতি দৃশ্য মুনি চাকমা সহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। এছাড়া জনগণ টিভি ও ইন্টেলেকেচুয়াল ফোরাম অব নর্থ ইস্ট-এর আয়োজনে এবং গুয়াহাটি চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ও অল আসাম চাকমা সোসাইটির সহযোগিতায় একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট র্যাডক্লিফ ঘোষণা (Radcliffe Award) প্রকাশের ঘটনাকে স্মরণ করা হয়। উক্ত ঘোষণার মাধ্যমে তৎকালীন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী ও অমুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। আলোচকগণ এই সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেন, যার প্রভাব আজও পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক ভূগোল, জনমিতিগত পরিবর্তন, ভূমি-সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর রয়েছে।
বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। তাদের অনেক সদস্য উত্তর-পূর্ব ভারতেও বসবাস করেন এবং বিভাজনের বহু আগে থেকেই তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান।
বক্তারা বলেন, দেশবিভাগের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, তা তাদের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এই কারণেই বৃহত্তর দেশভাগের ইতিহাস এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর এর চলমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে ১৭ আগস্টকে তুলে ধরা এই অনুষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।

আলোচনায় বক্তারা কাপ্তাই বাঁধের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ধ্বংসাত্মক পরিণতির কথা স্মরণ করেন এবং উক্ত প্রকল্পের কারণে প্রায় ১৮,০০০ আদিবাসী পরিবার, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ মানুষ, তাদের বাড়িঘর, গ্রাম এবং পূর্বপুরুষের ভূমি থেকে বাস্তুচ্যুত হন বলে উল্লেখ করেন। বক্তারা এই বাস্তুচ্যুতিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ, সামরিকীকরণ এবং আদিবাসীদের ভূমি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারানোর বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
বক্তারা বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও কম, আর অনাদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী অর্ধেকেরও বেশি বলে উল্লেখ করেন এবং সেখানে ধর্মান্তর, চলমান ভূমি বেদখল, সামরিক সম্প্রসারণ, পর্যটন, রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন এবং জলবায়ু ও সংরক্ষণ-সম্পর্কিত বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বক্তাগণ, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিকেও অঞ্চলটির রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও ভূমি-সংক্রান্ত প্রশ্ন মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে তুলে ধরেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন ও চুক্তির অধীনে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর কার্যক্রম নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।
বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশ্ন কেবল সেখানকার মানুষের প্রশ্ন নয়। এর প্রভাব উত্তর-পূর্ব ভারত এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখন্ডতার ওপরও পড়তে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অবশ্যই ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের, বিশেষ করে ত্রিপুরা ও মিজোরামের একেবারে সংলগ্ন। একই সঙ্গে এটি ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রামের ঠিক বাইরে অবস্থিত।
তাই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বঙ্গোপসাগর, চট্টগ্রাম, উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী একটি “ভূ-রাজনৈতিক সংযোগস্থল” হিসেবে বর্ণনা করা হয়।